আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে ওমান প্রদত্ত সম-নিয়ন্ত্রণ ও যৌথ পরিচালনার প্রস্তাব মঙ্গলবার (২৮ জুলাই, ২০২৬) সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। উল্টো পুরো প্রণালির প্রধান শিপিং লাইনগুলোতে নিজেদের একক আধিপত্য ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিতের নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে প্রস্তাবিত সমঝোতাকে ভেস্তে দিয়েছে তেহরান।
ওমানের মধ্যস্থতা প্রস্তাব ও ইরানের কঠোর অবস্থানের মূল দিকসমূহ:
- ওমানের সমঝোতা কাঠামো: বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত মোট জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ বহনকারী এই রুটটির স্বাভাবিকতা ফেরাতে ওমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে একটি আঞ্চলিক কাঠামোর প্রস্তাব দেয়। বিখ্যাত মালাক্কা প্রণালির যৌথ পরিচালনা পদ্ধতির আদলে গঠিত এই প্রস্তাবে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ৫০-৫০ বা সমমানের ভাগে ভাগ করে স্বেচ্ছাসেবী টোল আদায় এবং তা দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচল ও পরিবেশ সুরক্ষার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল।
- ইরানের শর্ত ও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাওয়াদি জানান, ওমানের ৫০-৫০ নিয়ন্ত্রণের এই ফর্মুলা ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। তেহরানের পাল্টা দাবি—প্রণালির একটি শিপিং লেন সম্পূর্ণ এবং দ্বিতীয় লেনের একাংশ সরাসরি ইরানি জলসীমার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মাসকাট যদি ইরানের এই চূড়ান্ত দাবি না মেনে নেয়, তবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
- ‘ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ বর্জন: গত ফেব্রুয়ারি থেকে মাইন আতঙ্কে আর্ন্তজাতিক স্বীকৃত ‘ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ (TSS) রুটটি অচল হয়ে রয়েছে। গারিবাওয়াদি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান আর আন্তর্জাতিক এই রুটকে স্বীকৃতি দেয় না এবং নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো তৃতীয় দেশকে এই প্রণালিতে মাইন অপসারণ কাজও চালাতে দেবে না।
- সেন্টকমের কড়াকড়ি ও মার্কিন অবস্থান: কূটনৈতিক আলোচনার গুঞ্জনের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রণালিতে তাদের ‘ইস্পাতকঠিন অবরোধ’ বজায় রাখার কথা জানিয়েছে। ২৮ জুলাইয়ের পর থেকে ইয়াঙ্কি বাহিনী অঞ্চলটিতে অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজের পথ বদলে দিতে বাধ্য করেছে এবং চারটি জাহাজ আটক বা বিকল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ইরানিদের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। কিন্তু তেহরানের নীতি-নির্ধারক ও কট্টরপন্থীদের ভৌগোলিক একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অনমনীয় মনোভাবের কারণে কৌশলগত এই পানিপথ পুনরুন্মুক্তের ইতিবাচক আঞ্চলিক প্রচেষ্টা আবারও গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ল।


















