বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নয়নে মা ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক অবদান অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তিনি যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন আমাদের মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক বা ফ্রি করেছিলেন। তাঁর সেই দূরদর্শী উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় আমরা এবার মেয়েদের অনার্স (স্নাতক) পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা ইনশাআল্লাহ সম্পূর্ণ ফ্রি বা অবৈতনিক করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একই সঙ্গে প্রাইমারি স্কুলে বর্তমানে যেভাবে স্টাইপেন বা উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, ঠিক একইভাবে উচ্চ শিক্ষায় যারা ভালো ফলাফল করবে, সেই সব মেধাবী মেয়েদের জন্য আমরা বিশেষ স্কলারশিপ বা বৃত্তির ব্যবস্থা করব। গতকাল বুধবার (১৫ জুলাই, ২০২৬) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদান নিয়ে একটি বিশেষ প্রামাণ্য ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে এবং ঝরে পড়া রোধে দুটি বড় কল্যাণমুখী উদ্যোগের কথা জানান। তিনি বলেন, আমরা সরকারের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে বাংলাদেশের সকল সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শিশুকে সম্পূর্ণ নতুন স্কুল ড্রেস উপহার দেব ইনশাআল্লাহ। পাশাপাশি স্কুলগুলোতে চলমান ‘মিডডে মিল’ (দুপুরের খাবার) কর্মসূচির ওপর ব্যাপক কাজ করা হচ্ছে, যাতে করে কোমলমতি বাচ্চারা আরও পুষ্টিকর ও উন্নতমানের খাবার খেতে পারে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, শিশুদের প্রকৃত মানুষ করার মূল কারিগর আপনারা। তাই আপনাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে, কোনো শিশু যেন কোনো অবস্থাতেই নির্দয় মানসিকতা নিয়ে বেড়ে না ওঠে— সেটি অন্য কোনো মানুষের প্রতি হোক কিংবা কোনো নিরীহ গৃহপালিত প্রাণী বা পশু-পাখির প্রতি হোক। কারো প্রতি যেন তারা নিষ্ঠুর না হয়, তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরম মমতায় ও মানবিকভাবে গড়ে তুলবেন। একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে আমাদের দক্ষ জনবলের পাশাপাশি প্রচুর মানবিক সৈনিক দরকার, আর এই মানবিক সৈনিক গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব আপনাদেরই। আমাদের শিশুরা যদি মানবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে, তবেই ভবিষ্যতে একটি সত্যিকারের মানবিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
উক্ত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন। সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসংখ্য খুদে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে মুখরিত এই অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত সেরা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানসমূহের হাতে মর্যাদাপূর্ণ পদক তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের মাঝেই খুদে শিক্ষার্থীদের দুটি দলের মধ্যে ‘মোবাইল শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক’ শীর্ষক বিষয়ের ওপর একটি চমৎকার ও প্রাণবন্ত বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় এবং এরপর শুরু হয় শিশুদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা প্রধানমন্ত্রী অতিথি সারিতে বসে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উপভোগ করেন। তিনি শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা করার ওপর জোর দেন এবং প্রতি বছর বর্ষাকালে নিজ হাতে অন্তত একটি করে গাছ রোপণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তোমরা প্রতি বছর একটি করে গাছ লাগাবে; গাছটাও বড় হবে, আর তার সাথে সাথে তোমরাও বড় হবে, এই গাছই হবে তোমাদের পরম বন্ধু।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি চারা রোপণের মাধ্যমে দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘গ্রিন স্কুল’ বা ‘সবুজ বিদ্যালয়’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন শেষে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য স্থাপিত বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্টল ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। এ সময় নিজ নিজ স্কুল ক্যাম্পাস সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং দৈনন্দিন ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে একে অপরকে সাহায্য করার জন্য শিশুদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।


















