বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি আসামির তালিকা নিয়ে দায়ের হওয়া মিরপুরের শহীদ ইমন হোসেন আকাশ হত্যা মামলার তদন্তে নেমে হতবাক হয়েছেন তদন্তকারীরা। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গুলিতে নিহত ইমনের মা ওই বছরের ২৭ আগস্ট ৬৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫০০-৬০০ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। কিন্তু মামলার দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের তদন্তে দেখা গেছে, মোট ৬৫০ জন এজাহারনামীয় আসামির মধ্যে ৫৪৯ জনেরই ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র ৯১ জনের অপরাধের প্রমাণ মিলেছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৩২ জন। শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে তিন জেলার ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নাম এই মামলায় ঢোকাতে গিয়ে নির্দোষ ৫৪৯ জনকে বাদ দেওয়ার পেছনেই তদন্তকারী কর্মকর্তার বেশির ভাগ সময় ব্যয় হয়েছে। ফলে দুই বছর কেটে গেলেও এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি পুলিশ।
সারা দেশের ১,৮৫৫ মামলার তদন্তে চরম বিপত্তি ও বাণিজ্যের অভিযোগ
শুধু মিরপুরের ইমন হত্যা মামলাই নয়, জুলাই গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে দায়ের হওয়া বেশির ভাগ মামলা নিয়েই চরম বিপত্তিতে পড়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তৎকালীন সময়ে তড়িঘড়ি করে ঢালাও ও ভুয়া আসামি করার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বর্তমানে তদন্তে ঠিক সেই জটিলতাই দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেক মামলায় ঘটনাস্থলের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই, আবার একই ঘটনায় একাধিক মামলা এবং বাদী কর্তৃক ভিকটিমকে চিনতে না পারার মতো অসংগতি রয়েছে। এর পাশাপাশি মামলাকে কেন্দ্র করে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগও উঠছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৭৯৯টিই হত্যা মামলা। তবে এই দুই বছরে মাত্র ১০৬টি মামলার চার্জশিট (হত্যা মামলা ৩১টি ও অন্য ধারার ৭৫টি) দাখিল করা সম্ভব হয়েছে।
পিবিআই-এর তদন্তে ৬৬% মামলা অপ্রমাণিত হওয়ার চিত্র
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) তদন্তাধীন ২৭২টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আদালতে সরাসরি দায়ের হওয়া (সিআর) মামলাগুলোর মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশই অপ্রমাণিত রয়ে গেছে। ১৯৫টি সিআর মামলার মধ্যে ১৪২টি নিষ্পত্তি হলেও মাত্র ৯০টি প্রমাণিত হয়েছে। বাকি অপ্রমাণিত মামলার মধ্যে ৬টিতে ভিকটিমকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি, ১৪টি মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং ৩টিতে বাদীর অসহযোগিতা ও সাক্ষ্যের অভাব রয়েছে। এছাড়া ১টি মামলায় বাদীকে মামলা করতে বাধ্য করা হয়েছিল। অন্যদিকে, থানায় দায়ের হওয়া ৭৭টি মামলার মধ্যে মাত্র ৩৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৪০টি মামলা এখনো মুলতবি রয়েছে। অর্থাৎ, ঢালাও আসামি ও তদন্তের নানা অসংগতির কারণে দুই বছরেরও বেশি সময়ে অর্ধেক মামলাও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত শেষে বৃদ্ধ, পঙ্গু ও শীর্ষ নেতাদের অব্যাহতির সুপারিশ
শহীদ ইমন হোসেন আকাশের (পিতা: মতিউর রহমান, মাতা: বেবী, স্থায়ী ঠিকানা: শরীয়তপুর) হত্যা মামলাটির তদন্তভার ধাপে ধাপে পল্লবী থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামের পর বর্তমানে পিবিআইয়ের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনের এসআই নুরুজ্জামানের হাতে রয়েছে। তদন্তে ১৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, মৃত্যু সনদ ও সিডিআর ($CDR$) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এজাহারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আনিসুল হকসহ শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি এমন অনেককে আসামি করা হয়েছে যারা প্যারালাইজড রোগী, বৃদ্ধ কিংবা পঙ্গু। অনেকের নাম-ঠিকানাও ভুয়া। পিবিআই জানিয়েছে, ঘটনার সময়কার ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বেশির ভাগ আসামির সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় খুব শীঘ্রই তাদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।


















