বাংলাদেশে তৈরি পোশাক (RMG) খাতে একের পর এক কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র তৈরি পোশাক সংকট ও মানবিক অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর ও সাভারসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে বেশ কয়েকটি বড় কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার শ্রমিক হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দ্রুত কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী মাসগুলোতে এই বন্ধের ধারা আরও দীর্ঘ হতে পারে, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন গণমাধ্যম ডব্লিউডব্লিউডি (WWD)-এর একটি সাম্প্রতিক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই উদ্বেগের চিত্রটি উঠে এসেছে।
ঈদের পরেই স্থায়ী বন্ধের হিড়িক ও শ্রমিকদের ক্ষোভ
পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে এসে অনেক শ্রমিক জানতে পারছেন যে তাদের দীর্ঘদিনের কর্মস্থলটি বন্ধ হয়ে গেছে। গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’ তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে আকস্মিকভাবে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক তাৎক্ষণিকভাবে জীবিকা হারিয়েছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, শ্রম আইন লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তাঁদের ছাঁটাই করা হয়েছে। অভিজ্ঞ ও পুরোনো শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি বেতন দিতে হয় বলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে পুরোনোদের বাদ দিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগের অনৈতিক পথ বেছে নিচ্ছে বলেও সাভারের ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা দাবি করেছেন। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে এই হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবারগুলোর সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ চালানোই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বন্ধের পেছনে মূল চার কারণ ও এলসি সংকট
পোশাক শিল্পের এই ধারাবাহিক পতনের পেছনে ব্যবসায়ীরা মূলত চারটি প্রধান কারণকে দায়ী করছেন:
- আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা: ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমে গেছে, ফলে বাংলাদেশের পোশাকের ক্রয়াদেশের (Order) প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই।
- উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের দফায় দফায় বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ পরিবহন খরচ, ডলার সংকট এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার উৎপাদন খরচকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
- শ্রম ব্যয় ও কম উৎপাদনশীলতা: শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ইতিবাচক হলেও, প্রযুক্তির অভাব ও উৎপাদনশীলতা (Productivity) না বাড়ায় অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিতে পারছে না।
- চলতি মূলধন ও ব্যাংকিং সমস্যা: বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রিজ (BCI)-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, শুরুতে অর্ডারের ঘাটতি থাকলেও পরবর্তীতে তা চলতি মূলধনের সংকটে রূপ নেয়। ব্যাংকগুলোতে ডলার সংকটের কারণে অনেক কারখানা সময়মতো ঋণপত্র বা এলসি (LC) খুলতে পারেনি, ফলে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে উৎপাদন পুরোপুরি থমকে গেছে।
বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে সাতটি শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ২০৫টি অর্ডারের অভাবে এবং ১৯০টি চরম আর্থিক সংকটে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
রি-স্কিলিংয়ের বাধা ও উত্তরণের চেষ্টা
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘এনশিওরিং আ জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ’স আরএমজি সেক্টর’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের পোশাক শ্রমিকদের ডিজিটাল নিরক্ষরতা এবং কারখানার মেশিনের নির্দেশিকাগুলো শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় হওয়াটা স্বয়ংক্রিয় বা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার (Re-skilling) ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রোবটকে কাজ শেখাতে পোশাক শ্রমিকদের ওপর এক অভিনব নজরদারি চালানো হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের কর্মসংস্থানকে আরও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
তবে এই সংকট মোকাবিলায় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) একটি আশাবাচী পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিইউএফটির সঙ্গে একটি যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আওতায় আগামী তিন বছরে ২২ হাজার ৮১৫ জন পোশাক শ্রমিক ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি চালনা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে, তাই অর্থনীতি সচল রাখতে ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ বেল-আউট প্যাকেজ বা সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।



















