জ্ঞাত আয়বহির্ভূত শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার চরম অপপ্রয়োগের অভিযোগে দেশের অন্যতম বিতর্কিত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ১৮৫টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার এই আসামি পলাতক রয়েছেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রীসহ আমেরিকা অথবা লন্ডনে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদক ও আদালতের ক্রোক নির্দেশ
হারুনের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে নেমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করছে এবং তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রি রোধে আদালতের মাধ্যমে ক্রোকের আদেশ জারি করছে।
- জমি ও ফ্ল্যাট জব্দ: চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশেষ জজ আদালতের নির্দেশে হারুনের প্রায় ১০০ বিঘা জমি, পাঁচটি ভবন, দুটি ফ্ল্যাট এবং তাঁর নামে থাকা ১০টি ব্যাংক হিসাব (যেখানে ১ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা জমা রয়েছে) অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
- পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা: দুদকের তদন্তে হারুনের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী শিরিন আক্তার (১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ) এবং ছোট ভাই এ বি এম শাহরিয়ারকে (প্রায় ১৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ) আসামি করা হয়েছে। এছাড়া হারুনের শ্বশুর মোহাম্মদ সোলাইমান এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহাঙ্গীর হোসেনের নামে থাকা বিপুল বেনামি সম্পদও দুদকের নজরে এসেছে।
- বিদেশে পাচার ও বিলাসবহুল বাড়ি: দুদকের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হারুনের স্ত্রীর নামে পাচার হওয়া প্রায় ১ হাজার ৫৩২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এফবিআই আটকে দিয়েছে। এছাড়া নিউইয়র্কে তাঁর স্ত্রীর নামে ৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বাড়ি এবং দুবাইয়ে সোনার দোকানের সন্ধান মিলেছে।
- মিঠামইনের ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’: কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয়দের জমি নামমাত্র মূল্যে দখল করে হারুন গড়ে তুলেছেন প্রায় ৪০ একর জমির ওপর শতকোটি টাকার বিলাস সাম্রাজ্য ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’।
যেভাবে আলোচনায় আসেন এবং ‘ভাতের হোটেল’ বিতর্ক
২০১১ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় প্রথম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসেন তৎকালীন তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন। এর পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দ্রুত পুলিশ বিভাগে নিজের ক্ষমতার বিস্তার ঘটান তিনি।
| ঘটনার বিবরণ | ক্ষমতার অপব্যবহার ও সমালোচনা |
| ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ | ২০২২ সালে ডিবি প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিযোগ নিয়ে আসা হাই প্রোফাইল ব্যক্তি ও শোবিজের তারকাদের ডিবি কার্যালয়ে দুপুরের খাবার খাইয়ে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতেন, যা আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অভিনব কৌশল ছিল বলে সমালোচকদের দাবি। |
| গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের আমল | এসপি থাকাকালীন সময়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যানের পরিবারকে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন। |
| সমন্বয়কদের তুলে নেওয়া ও পতন | ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে তুলে নিয়ে আসা এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার জেরে তীব্র সমালোচনার মুখে তাঁকে ডিবি প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। |
চাকরিজীবনের ২৬ বছরে মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বেতন পেলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল বিত্তবৈভব। প্রশাসনের ভেতরে থাকা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে এত মামলা ও ক্রোক আদেশের পরও তিনি এখনো আইনের নাগালের বাইরে রয়ে গেছেন।



















