পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই দেশজুড়ে আবারও জ্যামিতিক হারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকা তৈরির সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পশুর হাট, জমজমাট শপিংমল, ব্যস্ত বাস টার্মিনাল এবং ঈদকেন্দ্রিক নগদ লেনদেনের বড় কেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকার জালনোট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ জাল টাকাসহ কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও সিন্ডিকেটের এই অপতৎপরতা থামানো যাচ্ছে না। অপরাধ বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ ও লেনদেন বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের অসতর্কতা এবং হাটের উপচে পড়া ভিড়ের সুযোগ নিচ্ছে এই প্রতারক চক্র। দ্রুত টাকা গুনে লেনদেন শেষ করার তাড়াহুড়োয় অনেকেই আসল ও নকল নোটের পার্থক্য যাচাই করার সুযোগ পান না।
কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইন ডেলিভারি: গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অত্যন্ত কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে নিখুঁত জাল নোট তৈরি করছে চক্রগুলো। আগে যেখানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার ১০০টি জাল নোট (এক লাখ টাকা) তৈরি করতে ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হতো, আধুনিক প্রিন্টিং প্রযুক্তির কল্যাণে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র আড়াই হাজার টাকায়। বর্তমানে পাইকারি স্তরে প্রতি এক লাখ টাকার জাল নোটের বান্ডিল মাত্র ৬ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চক্রগুলো এখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে আধুনিক অনলাইনভিত্তিক ডেলিভারি ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করছে। ফেসবুক বা বিভিন্ন গ্রুপে সাংকেতিক পোস্ট দিয়ে জালনোট কেনাবেচার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বাজারে সহজে চালানো যায় বলে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটই সবচেয়ে বেশি জাল করা হচ্ছে। সাধারণ প্রিন্টার, বিশেষ গাম ও ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে আনা বিশেষ কাগজ, নিরাপত্তা সুতা ও হলোগ্রাম ব্যবহার করে এমন সূক্ষ্মভাবে এগুলো তৈরি করা হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তো বটেই, অনেক সময় সাধারণ জালনোট শনাক্তকারী স্ক্যানার মেশিনেও তা ধরা পড়ছে না।
উত্তরা-টঙ্গীতে অভিযান ও ৩৪ লাখ টাকার জালনোট জব্দ: ঈদকে সামনে রেখে জালনোটের বড় ধরনের চালানের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি রাজধানী উত্তরা ও গাজীপুরে ঝটিকা অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ। গত ১৪ মে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রথমে উত্তরা থেকে চক্রের মূল হোতা মজিবুর রহমানকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার একটি অস্থায়ী ডেরায় অভিযান চালিয়ে ৩৪ লাখ টাকার সমপরিমাণ জালনোট এবং নোট তৈরির বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও আধুনিক সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়। এ সময় চক্রের অন্য দুই সক্রিয় সদস্য দুলাল ও মামুনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে এই ৩৪ লাখ টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার মূল পরিকল্পনা ছিল তাদের।
জালনোট সিন্ডিকেটের মূল নেটওয়ার্ক:
┌─────────────────┐ ┌─────────────────────┐ ┌──────────────────┐
│ ডিজাইন ও প্রিন্টিং │ ───> │ পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিস │ ───> │ হাট ও শপিংমলে সরবরাহ│
└─────────────────┘ └─────────────────────┘ └──────────────────┘
দেশজুড়ে গোপন ছাপাখানার আস্তানা: তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, চক্রগুলো এখন আর কেবল সাধারণ ফটোকপি বা স্ক্যানারের ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া এবং ঢাকার বাইরে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নিরিবিলি আবাসিক ভবন, গ্যারেজ ও ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গোপনে অস্থায়ী কারখানা বা মিনি ছাপাখানা গড়ে তুলেছে। পুরো নেটওয়ার্কটি মূলত তিন স্তরে কাজ করে—প্রথম দল আসল নোট স্ক্যান করে গ্রাফিক্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজাইন ও নিখুঁত প্রিন্টিংয়ের কাজ করে, দ্বিতীয় দল আন্তঃজেলা কুরিয়ার, নৈশকোচ ও পণ্যবাহী যানের মাধ্যমে তা বিভিন্ন জেলায় পাচার করে এবং তৃতীয় দলটি মাঠপর্যায়ে ক্রেতা বা খুচরা বিক্রেতা সেজে হাটে-বাজারে তা ছড়িয়ে দেয়।
পশুর হাটে বিনামূল্যে টাকা যাচাইয়ের বুথ ও বিশেষজ্ঞদের মত: কোরবানির পশুর হাটে জালনোটের এই ভয়াবহ বিস্তার রুখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের গত ১০ মে জারিকৃত এক জরুরি সার্কুলার অনুযায়ী, দেশের অনুমোদিত প্রতিটি পশুর হাটে বাধ্যতামূলকভাবে ‘জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ’ স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের অভিজ্ঞ ক্যাশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত এই বুথগুলোতে বিক্রেতা ও ক্রেতাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নোট যাচাই ও টাকা গণনার বিরতিহীন সেবা দেওয়া হবে। ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক এবং সারুলিয়া বাজারে প্রিমিয়ার ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকার বাইরে সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখাগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে এই সেবা দেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, “জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামের সহজলভ্যতা, ফেসবুকভিত্তিক এজেন্ট নেটওয়ার্ক এবং জামিনে থাকা পুরোনো অপরাধীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারির অভাবের কারণেই এই অপরাধের লাগাম টানা কঠিন হচ্ছে।” তিনি ঈদকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদেরও বড় অঙ্কের লেনদেনের সময় টাকার জলছাপ, খসখসে লেখা ও নিরাপত্তা সুতা ভালোভাবে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেন।



















