দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এক গভীর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত সরকারের আমলের নীতি এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এই খাতে লোকসানের পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় বাজেটে।
সংকটের মূল কারণ ও বর্তমান অবস্থা:
- বিপুল ভর্তুকি: বিদ্যুৎ খাতে প্রতি বছর সরকারকে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী অর্থবছরে এটি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
- বকেয়া পরিশোধ: অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৬০ হাজার ২০০ কোটি টাকার বকেয়া এককালীন পরিশোধ করেছে।
- তথ্য বিভ্রান্তি: লোকসানের হিসাব নিয়ে অডিট রিপোর্ট ও সরকারি অর্থনৈতিক সমীক্ষার মধ্যে ব্যাপক গরমিল দেখা গেছে। অডিট অনুযায়ী লোকসান ১৭ হাজার কোটি টাকা হলেও সরকারি সমীক্ষায় তা প্রায় অর্ধেক দেখানো হয়েছে।
- বিশেষ বিধান আইনের প্রভাব: ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আওতায় অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তিগুলো এই খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বলে জাতীয় কমিটির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
আর্থিক অসামঞ্জস্য ও মূল্যের ব্যবধান:
জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে বা কেনায় খরচ হচ্ছে গড়ে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, অথচ বিক্রি করা হচ্ছে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও চ্যলেঞ্জ:
- মূল্যস্ফীতির চাপ: বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে বর্তমানের স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি (৮ শতাংশের ঘর) আবারও দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
- রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা: নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দাম বাড়ানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন। তবে লোকসান কমাতে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প পথও সীমিত।
- চুক্তি পুনর্বিবেচনা: আদানি গ্রুপ বা সামিট গ্রুপের মতো বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে করা উচ্চমূল্যের চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের সুপারিশ করেছে জাতীয় কমিটি।
বিদ্যুৎ খাতের এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে কঠোর সংস্কার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের ওপর কর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বোঝা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।



















