প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন আইনি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। জনপরামর্শ শেষে আগামী সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা সম্ভব না হলে পরবর্তী অধিবেশনে তা তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের একটি দল প্রবাসীদের আইনি সংকট সমাধানে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে এমন বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন ধরনের মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি বলেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়নের জন্য বর্তমানে খসড়া তৈরির কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়ায় রামরুকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতায় দ্রুত জনপরামর্শ শেষ করা সম্ভব হবে। আগামী সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা না গেলেও পরবর্তী অধিবেশনে তা আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধে ভোগান্তি
প্রবাসীদের সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধের উদাহরণ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সেই অর্থ ফেরত চাইতে গিয়ে অনেক প্রবাসী আইনি জটিলতায় পড়েন। আবার দেশে সম্পত্তি কেনার পরও নানা ধরনের বিরোধ তৈরি হয়।
এসব মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকায় প্রবাসীদের বিদেশে অবস্থান করেও আইনজীবীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রবাসীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদেরও মামলা চালিয়ে যেতে হয়।
মন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইন ও বিশেষ শ্রম আদালতের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের আইনি সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের জন্যও বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
প্রবাসীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা
প্রবাসীদের আইনি সহায়তায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে নিজেদের আইনি বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এ জন্য একটি হটলাইনও রয়েছে।
রামরুকে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে প্রবাসীরা প্রাথমিক আইনি পরামর্শ পেতে পারবেন। অধিদপ্তরে কয়েকজন আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ের কর্মকর্তাও রয়েছেন।
এসব কর্মকর্তা আইনি পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করছেন, যাতে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমানো যায় বলে জানান মন্ত্রী।
আমিরাতে পাঁচ হাজার ভিসা বাতিলের তথ্য
প্রবাসী শ্রমিকদের সংকটের পেছনে অসাধু ব্যবসায়ী ও রিক্রুটিং এজেন্সির ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনেক বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে এবং অনেকের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে না। ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার ভিসা বাতিল হয়েছে বলে জানান তিনি। আরও অনেকের ভিসার বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে এমন নথি জমা দেওয়া হচ্ছে, যেগুলোর সত্যতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেও সহজে যাচাই করা সম্ভব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন প্রতিষ্ঠানের সনদ জমা দেওয়া হয়েছে, যার বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। এসব অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের অনিয়মের কারণে প্রবাসী শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি প্রবাসী শ্রমিকেরা
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক, কৃষি, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং চা রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর পাশাপাশি শ্রমশক্তি রপ্তানিও দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে প্রবাসী শ্রমিকেরা যে আয় করেন, তা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি দুবাই সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের অনেককে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের কষ্টের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, অনেক শ্রমিককে সকালে বাথরুম ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এরপর কর্মস্থলে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা আগে রওনা দিতে হয়। সারাদিন কাজ শেষে আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাত ৮টা বা ৯টার দিকে বাসায় ফিরতে হয়। ফিরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি রান্নার কাজও করতে হয়।
এত পরিশ্রমের পরও বাংলাদেশি শ্রমিকেরা অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পান বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিভিন্ন দেশে শ্রমের মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী।
রামরুর ৩০ বছরের ভূমিকার প্রশংসা
রামরুর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকার প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে অভিবাসীদের কল্যাণ, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করার দূরদর্শিতা প্রতিষ্ঠানটি তিন দশক আগেই দেখিয়েছিল। এখনো তারা এ খাতে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ৩০ বছরে রামরু শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, শ্রমিকদের নামে অর্থ সংগ্রহ করে তহবিল তছরুপ কিংবা শ্রমিককল্যাণ নীতি নির্ধারণে অসচ্ছতার অভিযোগ ছাড়াই স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজেদের চিন্তা ও সুপারিশ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার কারণে সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও প্রতিষ্ঠানটির ইতিবাচক উদ্যোগের সঙ্গে সরকার থাকবে।
আগামী দিনেও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় রামরুর ভালো উদ্যোগগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দেন আইনমন্ত্রী। প্রতিষ্ঠানটির ৩০ বছরের যাত্রা আগামী ১০০ বছরে বিস্তৃত হোক এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে যাক—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
একই সঙ্গে এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানান আইনমন্ত্রী, যেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা দেশে ফিরে আসতে পারবেন এবং বাংলাদেশও অন্য দেশ থেকে অভিবাসী শ্রমিক গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করবে।


















