শনিবার , ৩ অক্টোবর ২০২৬ |
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

কভিডের পর তালাবদ্ধ ২৪০ আইসিইউ, অচল ১৪১ পিসিআর ল্যাব

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
অক্টোবর ৩, ২০২৬ ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

কভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ সময়ে মানুষের জীবন রক্ষায় দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দ্রুত স্থাপন করা হয়েছিল নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (আইসিইউ) ও আরটি-পিসিআর ল্যাব। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম। কিন্তু মহামারি পরিস্থিতি কমে যাওয়ার পর এসব অবকাঠামোর বড় একটি অংশ এখন আর নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কভিডকালীন প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা ২৪০টি আইসিইউ শয্যার বড় অংশ জনবল সংকটে অকার্যকর বা সীমিত পরিসরে চলছে। একইভাবে স্থাপন করা ১৬২টি আরটি-পিসিআর ল্যাবের মধ্যে ১৪১টিই বর্তমানে বিভিন্ন কারণে অকার্যকর। কোথাও প্রয়োজনীয় জনবল নেই, কোথাও রি-এজেন্টের সংকট, আবার কোথাও কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব আইসিইউ ও পিসিআর ল্যাব শুধু কভিড মোকাবেলার জন্য নয়। অন্যান্য সংক্রামক রোগ শনাক্ত, গুরুতর রোগীর চিকিৎসা এবং হাম-ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলাতেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কভিড-পরবর্তী সময়ে এসব সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।

২৫ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা ব্যাহত

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সাল থেকে ২২ জেলায় ২৪০টি আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়। এগুলো পরিচালনার জন্য মেডিক্যাল অফিসার, নার্স ও টেকনোলজিস্টসহ এক হাজার ১৫৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

তবে তাঁদের চুক্তির মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যায়। এরপর স্থায়ীভাবে জনবল রাখার বা বিকল্প জনবল নিয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কোথাও হাসপাতালের নিজস্ব জনবল দিয়ে সীমিতভাবে আইসিইউ চালানো হচ্ছে, আবার কোথাও পুরো সেবাই বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, যশোর জেনারেল হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ অন্তত পাঁচটি হাসপাতালে আইসিইউ পুরোপুরি চালু নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে আরও ১৪টি হাসপাতালে আইসিইউ পুরোপুরি অচল।

অন্যদিকে গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজধানীর ইনফেকশাস ডিজিজেস হাসপাতালে সীমিত পরিসরে আইসিইউ সেবা চালু রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪২ জেলার ৭৪টি সরকারি হাসপাতালে মোট এক হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর ২২টি সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৭৫৮টি। অর্থাৎ সরকারি আইসিইউ শয্যার প্রায় ৫৫ শতাংশই ঢাকায়।

ফলে দেশের ২২টি জেলায় সরকারি পর্যায়ে কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সেবা সীমিত থাকায় গুরুতর রোগীদের রাজধানীমুখী হওয়ার চাপ বাড়ছে।

২১১ কোটি টাকার পিসিআর ল্যাবেও তালা

কভিড শনাক্তে ২০২০ সালে সরকারি অর্থ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেশের সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ১৬২টি আরটি-পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়। এসব ল্যাব স্থাপনে ব্যয় হয় প্রায় ২১১ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২৩টি ল্যাব সচল থাকলেও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬২টির মধ্যে ১৪১টি ল্যাব বিভিন্ন কারণে অকার্যকর। কোথাও রি-এজেন্টের অভাবে পরীক্ষা বন্ধ, কোথাও দক্ষ জনবলের সংকট, আবার কোথাও যন্ত্রপাতি নষ্ট বা অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

কুষ্টিয়ার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত পিসিআর ল্যাবও বর্তমানে বন্ধ। গত বছর সেখানে চুরির ঘটনায় পিসিআর যন্ত্র, মনিটর, ডেস্কটপ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অংশসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের পিসিআর ল্যাব কাগজে-কলমে সচল থাকলেও কভিড পরীক্ষা না থাকায় নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না। রাজধানীর কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ল্যাবও কয়েক মাস ধরে বন্ধ।

তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে কভিড-পরবর্তী সময়েও এসব ল্যাব অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের দুটি ল্যাবের একটি যক্ষ্মা ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ শনাক্তে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজে নিয়মিত পরীক্ষা চলছে। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের পিসিআর মেশিন গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রেও বড় ঘাটতি

সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায় ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের রোগ নির্ণয়কারী যন্ত্রের ৫২ শতাংশ গত এক বছরেও ব্যবহার হয়নি।

এর প্রধান কারণ রি-এজেন্টের ঘাটতি, যা ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। এরপর রয়েছে অকেজো যন্ত্রপাতি ৩৪ শতাংশ এবং দক্ষ জনবলের অভাব ১৯ শতাংশ।

নথিতে যন্ত্রের সেবাপ্রাপ্যতা ৬৫ শতাংশ থাকলেও নিয়মিত সেবা মিলছে মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। জেলা হাসপাতালে এ হার ৩৩ শতাংশ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ শতাংশ এবং মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ২৫ শতাংশ।

সেবা ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ অকেজো যন্ত্রপাতি। এ কারণে ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সেবা ব্যাহত হয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি ১৪ শতাংশ এবং প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্টের অভাব ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সেবা ব্যাহত হওয়ার কারণ।

মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ছয় হাজার ৪০৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন তিন হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদই শূন্য।

ওষুধের প্রাপ্যতাও কম। গড়ে প্রয়োজনীয় ওষুধের মাত্র ২২ শতাংশ পাওয়া যাচ্ছে। মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে এ হার ১২ শতাংশ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ।

মহামারির সক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনার ঘাটতি

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কভিড মহামারির সময় জরুরি প্রয়োজনে যে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল তৈরি করা হয়েছিল, তা ধরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ফলে একদিকে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সক্ষমতা অকার্যকর হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বিপুল অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহারে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, কভিডকালীন সংকট থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলার পরিকল্পনাও যথেষ্ট নয়।

তিনি আরও বলেন, নতুন চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য নিয়মিত রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং দায়িত্ব পরিবর্তনের সময় প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান যথাযথভাবে হস্তান্তর না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, কভিডের সময় তৈরি হওয়া আইসিইউ ও পিসিআর ল্যাবগুলোকে পরবর্তী সময়ে কীভাবে অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সহায়তার অভাবেও এসব সুবিধা কার্যকর রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, অসমাপ্ত কাজও রয়েছে

ইআরপিপি প্রকল্পে শুধু আইসিইউ ও পিসিআর ল্যাব নয়, আরও বিভিন্ন স্বাস্থ্য অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে ৩৩টি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ, ১৬টি মেডিক্যাল কলেজে শিশু আইসিইউ, ১৫টিতে প্রসূতি আইসিইউ, ১৯টি হাসপাতালে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব, ৩০টি হাসপাতালে তরল মেডিক্যাল অক্সিজেন ব্যবস্থা এবং ২০টি হাসপাতালে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনেক অবকাঠামোর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও যন্ত্রপাতি কেনা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে, নাকি অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্প শেষ ঘোষণা করা হবে—তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসক, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা চাকরি স্থায়ীকরণ ও বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে একাধিকবার আন্দোলন করেছেন। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের অধীনে কর্মরত এক হাজার চারজন চার মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

মহামারির শিক্ষা কি হারিয়ে যাচ্ছে?

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম কভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণ অনেক কমে এলেও রোগ শনাক্তকরণ ও গুরুতর রোগীর চিকিৎসায় প্রস্তুত সক্ষমতার প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, কভিড সংক্রমণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি মহামারির সময় গড়ে তোলা চিকিৎসা সক্ষমতাও অকার্যকর হয়ে থাকবে? তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংক্রামক রোগ বা মহামারি দেখা দিলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য বর্তমান অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল ধরে রাখার কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সর্বশেষ - অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত