দেশের প্রায় দুই কোটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিফায়েড এডু আইডি ও স্মার্ট কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রস্তাবিত একটি মেগাপ্রকল্পের আওতায় এসব ডিজিটাল পরিচয়পত্র তৈরি করা হবে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এডু আইডি, স্মার্ট কার্ড, কেন্দ্রীয় সার্ভার ও ডেটাবেইস তৈরিতে এ অর্থ ব্যয় হবে। সে হিসাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার টাকা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এশিয়া পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার আওতায় আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নাম ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন’। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য সম্প্রতি এটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মাউশি। চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে দেশের সিটি করপোরেশন, জেলা শহর ও উপজেলা এলাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এ সুবিধার আওতায় আসবে।
আগে হবে সম্ভাব্যতা যাচাই
মূল প্রকল্প শুরুর আগে এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পৃথক একটি সমীক্ষা প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদের এ সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে কনসালট্যান্সি সেবায় ৪৩৭ দশমিক ৯২ লাখ টাকা, ওয়ার্কশপ আয়োজনে ৩০ লাখ টাকা, কম্পিউটার সরঞ্জামে ৮ দশমিক ৬০ লাখ টাকা এবং সম্মানি খাতে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মূল প্রকল্পের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ও চূড়ান্ত বাজেট কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
তৈরি হবে বিশাল ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার
প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তথ্য নিয়ে একটি বড় ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরি করা হবে। এটি পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় সার্ভার ও ডেটাবেইস স্থাপন করা হবে। এডু আইডি, স্মার্ট কার্ড, সার্ভার ও ডেটাবেইস—সব মিলিয়ে এ খাতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষককে বিনা মূল্যে আধুনিক ট্যাবলেট কম্পিউটার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ট্যাবের গড় মূল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
শুধু ডিভাইস সরবরাহ নয়, শিক্ষকদের আধুনিক ই-লার্নিং পদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা থাকবে। ডিজিটাল পেডাগজি ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্লাস পরিচালনার প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ট্যাব সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ মিলিয়ে এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ প্যানেল
প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ এডুকেশন প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়নে এ খাতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমাতে সব প্রতিষ্ঠানে ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ, ক্যাম্পাস এরিয়া নেটওয়ার্ক এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার মান তদারকিতে কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), জাতীয় কনটেন্ট রিপোজিটরি এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও ডেটা অ্যানালিটিকস সিস্টেম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ, ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক, এলএমএস-কনটেন্ট রিপোজিটরি এবং মনিটরিং-অ্যানালিটিকস ব্যবস্থায় প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া প্রশাসনিক ব্যয়ে ১২০ কোটি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সম্মানিতে ৬০ কোটি এবং সাধারণ থোক বরাদ্দ হিসেবে আরও ১৫০ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এআই ও কোডিং শিক্ষায় গুরুত্ব
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্য রয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোডিং, আইসিটি ল্যাব ও স্মার্ট শ্রেণিকক্ষের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি আনন্দদায়ক শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্তির জন্য অডিও-ভিজ্যুয়াল ও ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল ব্যবধান কমানো এবং শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্ববাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাব ও পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন এবং পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষে এর চূড়ান্ত ব্যয়, বাস্তবায়ন কাঠামো ও সময়সূচি নির্ধারিত হবে।


















