টানা খরা ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে তীব্র সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র সরকারি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। হ্রদে পানির সংকট তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মোট পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে তিনটি ইউনিটের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রের মাত্র দুটি ইউনিট সচল রাখা সম্ভব হয়েছে, যা থেকে দৈনিক মাত্র ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে যদি ভারী বৃষ্টিপাত না হয়, তবে হ্রদের পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে। এতে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চলমান দুটি ইউনিটের মধ্যে আরও একটি ইউনিট জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে।
রুল কার্ভের তুলনায় পানির স্তরের বর্তমান চিত্র
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুম ও কারিগরি সূত্র অনুযায়ী, হ্রদের পানির পরিমাণ পরিমাপের জন্য নির্ধারিত রুল কার্ভের (Rule Curve) চেয়ে বর্তমান পানির স্তর অনেক নিচে অবস্থান করছে:
- স্বাভাবিক পানির স্তর: রুল কার্ভের পরিমাপ অনুযায়ী বছরের এই সময়ে কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর থাকার কথা অন্তত ৭৮ দশমিক ৩৪ ফুট মিন সি লেভেল (MSL)।
- বর্তমান পানির স্তর: খরা পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে হ্রদের পানির স্তর নেমে এসেছে ৭৩ দশমিক ৯১ ফুটে। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় হ্রদে পানির স্তর এখন ৪ দশমিক ৪৩ ফুট কম রয়েছে।
সচল ইউনিটের বিবরণ ও বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা
বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২ নম্বর এবং ৩ নম্বর ইউনিটটি চালু রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া কোনোমতে সচল রাখা হয়েছে:
| সচল ইউনিটের নাম | বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন |
| ২ নম্বর ইউনিট | ৩২ মেগাওয়াট |
| ৩ নম্বর ইউনিট | ২৮ মেগাওয়াট |
| সর্বমোট উৎপাদন | ৬০ মেগাওয়াট |
উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় দেশের বৃহত্তম ও একমাত্র এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পূর্ণ সক্ষমতায় চললে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদিত এই সীমিত ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে (National Grid) সরবরাহ করা হচ্ছে।
পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান গণমাধ্যমকে জানান, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে হ্রদের পানি আরও কমে যাওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে এবং তেমনটা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এদিকে হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে কাপ্তাই হ্রদের পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে যাবে, যার নেতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই পড়বে না, বরং হ্রদের ওপর নির্ভরশীল নৌ-যোগাযোগ, মৎস্য চাষ, স্থানীয় পরিবেশ এবং পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।



















