মার্কিন মধ্যস্থতায় গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে (১৭ এপ্রিল) শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির তোয়াক্কা না করে দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননজুড়ে আবারও নতুন করে ভয়াবহ বিমান ও স্থল হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী হামলায় অন্তত চারজন শিশু ও তিনজন নারীসহ অন্তত ৩১ জন লেবানিজ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৪০ জনেরও বেশি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার (সুর) জেলার বুর্জ আল-শামালি, কাওথারিয়াত আল-রিজ, হাব্বুশ, মারাকাহ এবং সালাহ শহরকে লক্ষ্য করে এই তীব্র বিমান হামলাগুলো চালানো হয়। এর মধ্যে বুর্জ আল-শামালি এলাকার একটি জনবহুল আবাসিক এলাকায় চালানো একটি মাত্র বিমান হামলাতেই নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া পূর্ব লেবাননের ঐতিহাসিক মারজায়ুন ও বালবেক (বেকা উপত্যকা) অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তম পানির আধার ‘কারাউন বাঁধ’ সংলগ্ন এলাকায় অন্তত তিনটি বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, যাতে একটি গণ হাসপাতালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং উদ্ধারকাজ চালানোর সময় দ্বিতীয় দফার (ডাবল-ট্যাপ) হামলায় এক সিভিল ডিফেন্স উদ্ধারকর্মী নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার জবাবে তারা রাতভর লেবাননজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির ১০০টিরও বেশি কৌশলগত সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্রাগার ও পর্যবেক্ষণ চৌকি গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী বিমান হামলার ঠিক আগের দিনই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবানন সীমান্তে সামরিক অভিযান আরও বহুগুণ জোরদার করার এবং গোষ্ঠীটিকে সম্পূর্ণ ‘দমন’ করার কড়া অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। গতকাল সোমবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, হিজবুল্লাহ যেহেতু ফাইবার-অপ্টিক ড্রোন ব্যবহার করে উত্তর ইসরায়েলের বসতি ও আইডিএফ সেনাদের ওপর অনবরত হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে, তাই তিনি সামরিক বাহিনীকে লেবাননে আক্রমণের তীব্রতা ও ফায়ারপাওয়ার আরও বাড়াতে এবং তাদের ওপর চরম আঘাত হানতে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তীতে মঙ্গলবার রাতে তেল আবিবে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ইসরায়েল বর্তমানে লেবাননে তাদের স্থল ও আকাশ অভিযান আরও গভীর ও বিস্তৃত করছে। নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, আইডিএফ বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের সীমানা বা পূর্বনির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ (হলুদ রেখা) অতিক্রম করে বিশাল স্থলবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের দখল নিচ্ছে, যাতে সীমান্ত সংলগ্ন ‘নিরাপত্তা অঞ্চলকে (Security Zone) আরও শক্তিশালী’ করে উত্তর ইসরায়েলের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের ঘরে ফেরানো যায়।
বর্তমান এই চরম যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনাকে পুরোপুরি ভেস্তে দেওয়ার গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে। একদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দোহা আলোচনাকে সফল করতে সময় চাওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে আমেরিকার সাথে যেকোনো শান্তি চুক্তির প্রধান শর্তই হতে হবে লেবানন ও গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। এই ত্রিমুখী রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার দোহা বৈঠকের মাঝেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দক্ষিণ ইরানে নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল ইরানি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরে মাইন পুঁতে রাখার চেষ্টায় থাকা নৌযান ধ্বংস করা। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উগ্র-ডানপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রীদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের এই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।



















