ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ দেড় বছর সময় পার হলেও দেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো কার্যকর পথ খুঁজে পাচ্ছে না। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় এবং পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোয় দলটির অভ্যন্তরে ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ দল গঠনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি মৃত। ক্ষমতার দীর্ঘ স্বাদ হারানোর পর মাঠের নিয়ন্ত্রণহীন দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সব স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে এবং তারা এক দীর্ঘ ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ দিন পার করছেন। দলটির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দলটির আন্তর্জাতিক বন্ধুরাষ্ট্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিতর্কিত ও হাইব্রিড নেতাদের বাদ দিয়ে সংস্কারের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্যদের নেতৃত্বে আনার জোরালো পরামর্শ দিয়েছিলেন; কিন্তু দলটির বর্তমান কাঠামোয় সংস্কারের সেই সমস্ত পথ আপাতত সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের কঠোর অবস্থান। অনেক সাবেক সংসদ সদস্য এবং ব্যবসায়ী জ্যেষ্ঠ নেতা এখন নিজেদের পিঠ বাঁচাতে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন। অন্যদিকে, ভারত, ইউরোপ ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পলাতক ও আশ্রয় নেওয়া নেতারাও তীব্র আর্থিক সংকটে ভুগছেন এবং ঢাকার বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে ভারত ছেড়ে সাইপ্রাস বা মালয়েশিয়ার মতো নিরাপদ দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। দলের এই দুর্দিনেও ভেতরে এখনো কট্টরপন্থী নেতারাই সবচেয়ে বেশি দাপট দেখাচ্ছেন, যারা কোনো ধরনের ভুল স্বীকার বা জনগণের কাছে অনুশোচনা করার ঘোর বিরোধী। তাদের ধারণা, বর্তমান নির্বাচিত সরকার কোনো বড় ভুল করলে বা দেশের মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠলে তারা পুনরায় মাঠে নামার সুযোগ পাবেন এবং এই সুযোগ তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পুরোনো কাঠামোতেই চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, বিগত ১৫ বছরের শাসন ও জুলাই অভ্যুত্থানে ঘটিত অপরাধের জন্য জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চেয়ে গায়ের জোরে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করলে তা আওয়ামী লীগের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জোরপূর্বক ফেরার চেষ্টা করা হলে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে রাজপথে তাদের মোকাবিলা করবে, যা দেশের জন্য রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, দলটিকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ না করে যদি জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো যেত, তবে তারা এই ‘নিষেধাজ্ঞার’ অজুহাতে নিজেদের ‘ভিকটিম’ বা ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করার বাড়তি সুযোগ পেত না। বর্তমানে দেশে আত্মগোপনে থেকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম অনলাইন ও বিভিন্ন মাধ্যমে দল গোছানোর ঝটিকা চেষ্টা চালালেও রাজনৈতিক অবস্থান ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে দলটির ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকার ও অনিশ্চিত।



















