ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোমবার (১১ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৪.৫০ ডলার এবং মার্কিন অপরিশোধিত তেলের (WTI) দাম ৯৮.৪৮ ডলারে পৌঁছেছে। মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করার পর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে, যা সরাসরি তেলের বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা ও ট্রাম্পের অবস্থান পাক-মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনায় ইরান একটি ১০ দফা প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তার অনেকগুলোই প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কিছু নির্দিষ্ট ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যার মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের বিষয়টি অন্যতম। তবে ইরান তার পরমাণু সক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্বের তেল পরিবহনের প্রধান ধমনী—পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে নেই বললেই চলে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ ও বৈশ্বিক প্রভাব বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংকটের কারণে বর্তমানে প্রায় ১,৫৫০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ও সাড়ে ২২ হাজার নাবিক সেখানে আটকা পড়ে আছেন। ইরান হুমকি দিয়েছে যে, যেসব দেশ তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, তাদের জাহাজগুলো এই পথে ‘চরম সমস্যার’ সম্মুখীন হবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ অমান্যকারী দুটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, যা সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই উচ্চমূল্য বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:
- আমদানি ব্যয়: তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৫ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি খরচ প্রায় ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যেতে পারে।
- রপ্তানি খাত: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) রপ্তানির একটি বড় অংশ এই রুট দিয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় রপ্তানি খরচ প্রায় ৩৫% পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
- মূল্যস্ফীতি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও সেচ খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্যের ওপর। সানেম-এর (SANEM) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সংকটের ফলে দেশের জিডিপি (GDP) ১.২% পর্যন্ত কমতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে।



















