টানা পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা ও নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর ওয়াইজঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
দুপুর থেকেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যের তালে রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির ও মহল্লা থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে প্রতিমাগুলো বুড়িগঙ্গার তীরে আসতে শুরু করে। পরে নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে ভক্তদের মধ্যে বিরাজ করে বিদায়ের বিষাদ।
কারও চোখে ছিল অশ্রু, কারও কণ্ঠে দেবীবন্দনা। শেষ মুহূর্তে অনেকে দেবীর কাছে দেশ ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন। কেউ কেউ নদীর পানি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শরীরে ছিটিয়ে নেন।
মহাখালী থেকে বাবার সঙ্গে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়স্মিতা জানায়, দশমীর লগ্ন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মন খারাপ হতে শুরু করেছে। কয়েক দিন দেবী দুর্গার আগমনে আনন্দে কেটেছে সময়। এখন দেবীর বিদায়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। তার প্রার্থনা, দেবী যেন দেশ থেকে সব অপশক্তি দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সবাইকে ভালো রাখেন।
পুরান ঢাকার হাজারীবাগ গণকটুলী থেকে আসা রীমা রানীও জানান, পূজার দিনগুলো ছিল আনন্দে ভরা। দেবী দুর্গার উপস্থিতিতে চারপাশ উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল। তবে বিসর্জনের দিনে বিদায়ের কষ্টও অনুভব করছেন তিনি। আবারও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে দেবীর আগমনের জন্য। এবারের পূজায় তার বিশেষ প্রার্থনা ছিল, দেশ যেন শান্তিময় হয় এবং সবার জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে।
ধানমন্ডি থানা পূজা উদযাপন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শ্রী রাজিব কুন্ডু বলেন, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দেবীকে বিদায় জানাতে এসেছেন তারা। অশুভ শক্তির বিনাশ ও মানুষের কল্যাণের প্রত্যাশায় দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করেছেন। তিনি একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি অন্যায়-অপরাধ দূর হওয়া এবং দেশের সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করার কামনা করেন।
এর আগে দশমীর সকালে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ ও মন্দিরে পূজার অন্যতম প্রধান আচার সিঁদুর খেলা অনুষ্ঠিত হয়। নারীরা দেবী দুর্গার পায়ে সিঁদুর নিবেদন করে শ্রদ্ধা জানান। পরে একে অপরের গায়ে সিঁদুর মাখিয়ে সুখ, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করেন।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর ওয়াইজঘাট ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিসর্জন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। শোভাযাত্রার নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষায়িত দল সোয়াট, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্য এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কয়েক শ সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন জানান, ওয়াইজঘাটসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় পোশাকধারী ও সাদাপোশাকের পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত ছিল।
তিনি আরও জানান, গত বছর প্রতিমা বিসর্জনের জন্য একটি স্থান নির্ধারিত থাকলেও এবার তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিমাবাহী ট্রাকের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সড়ক একমুখী করা হয়। বিসর্জন শেষে ট্রাকগুলো যাতে সহজে বের হয়ে যেতে পারে, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়। পাশাপাশি যানজট এড়াতে পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের আনন্দ ও বিদায়ের বিষাদ সঙ্গে নিয়ে আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় থাকবেন ভক্তরা।


















