হাম ও ডেঙ্গুসহ সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সবাইকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। শনিবার দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সরকারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। ২০২০ সালের পর নিয়মিতভাবে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার প্রয়োজন থাকলেও দীর্ঘ সময় এ কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি কেনাকাটার পরিবর্তে আগের সরকার ওপেন টেন্ডার ব্যবস্থায় যেতে চেয়েছিল। বিদেশি সংস্থাগুলোর অনুরোধ সত্ত্বেও বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হওয়ায় সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এর ফলে টিকাদানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী সময়ে সামলাতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ইউনিসেফের নির্ধারিত তিন ধাপে ১৮টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ঢাকা ও আরও দুটি বড় সিটি করপোরেশনকে এর আওতায় আনা হয়। এরপর নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়। এ কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া ও অপুষ্টি। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা হাম আক্রান্ত হলে দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অবস্থায় পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতি মাত্র ১৫০ টাকা খরচে বোতলভিত্তিক সিপ্যাপ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেন নিতে না পারা শিশুদের এই পদ্ধতির মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মহামারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও চিকিৎসকদের ত্যাগ ও পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আক্রান্ত শিশুর কাছাকাছি থাকা, একই বিছানায় একাধিক শিশুর থাকা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ভিটামিন-এ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে ২ কোটি ২৫ লাখ শিশু অন্তর্ভুক্ত হলেও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু টিকা পেয়েছিল। দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর ব্যবধানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আরও প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে শনাক্ত করে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এরপরও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন করে ক্যাচআপ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ইউনিসেফ ১০ দিনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করেছে। আগের মজুতসহ এবার ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২৪ লাখ আগে বাদ পড়া শিশু রয়েছে।
তিনি জানান, আজ থেকে সারাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প স্থাপন এবং প্রতিটি উপজেলায় প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ইউএনও ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে জোরদারভাবে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। কর্মসূচি সফল করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
কর্মজীবী মায়েদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বন্ধের দিনেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম চলবে। ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান কর্মসূচির পরও প্রায় ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুত থাকবে। ইতোমধ্যে ৪৩ লাখ ডোজ টিকা বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মপআপ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার জন্যও টিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।


















