প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত বেইজিং সফরের মধ্য দিয়ে চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক ও সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। আজ শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ ব্রিফিংয়ে সফরপরবর্তী বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরে তিনি এই মন্তব্য করেন। কূটনৈতিক মহলে একটি বিশেষ মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চীনের বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অন্য দেশের সরকারপ্রধানদের নির্ধারিত সূচি বজায় রেখেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় নিয়ে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন, যা দুই দেশের গভীর সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ।
চীনের সাথে ৮টি সমঝোতা, ৩টি চুক্তি ও তিস্তা প্রকল্প
সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট ৮টি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং ৩টি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। স্বাক্ষরিত চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই ক্ষেত্র—মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষায়িত ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (China EPZ) নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের উত্তর অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (Feasibility Study) বিষয়ে দুই দেশ যৌথভাবে একমত হয়েছে। তবে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত সরাসরি যোগাযোগের জন্য যে ‘চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’-এর প্রস্তাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ভূ-কৌশলগত দিক বিবেচনা করে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
মালয়েশিয়া সফরে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা
চীনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরেও বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের অফিশিয়াল মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওচিত্রই প্রমাণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যকার ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কতটা গভীর ও সুদৃঢ় হয়েছে।
এই সফরে দুই দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ ও দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘নোট অব ভার্বাল’ (Diplomatic Note) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে একটি যুগান্তকারী ‘মুক্তবাণিজ্য চুক্তি’ (FTA) স্বাক্ষর করার লক্ষ্যে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়াতে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক বসবাস করছেন উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসন ও আন্তর্জাতিকভাবে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নীতিগত বিষয়ে দুই দেশ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করবে।
বাংলাদেশের ব্রিকস ও সাংহাই কনভেনশনে যোগদানে চীনের পূর্ণ সমর্থন
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বিশেষ বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে জানান, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, চীন বাংলাদেশের যেকোনো অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবসময় একটি ‘স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু’ হিসেবে পাশে থাকতে চায়। এর পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে দ্রুত বিকাশমান বহুজাতিক অর্থনৈতিক জোট ‘ব্রিকস’ (BRICS) এবং এশিয়ার শক্তিশালী নিরাপত্তা জোট ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা’ বা সাংহাই কনভেনশনে (SCO) বাংলাদেশের নতুন পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে পরাশক্তি চীন আন্তর্জাতিকভাবে তাদের পূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেবে বলে বেইজিং আশ্বস্ত করেছে।



















