ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার শেষ পর্যায়ে একাধিকবার সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও প্রতিবারই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের দূরদর্শী হস্তক্ষেপে আলোচনা সচল থাকে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সোমবার (১৫ জুন) পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে দেওয়া এক নীতি-নির্ধারণী বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান নেপথ্যে থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
পর্দার আড়ালের কূটনীতি ও আসিম মুনিরের ভূমিকা
জাতীয় পরিষদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে পর্দার আড়ালে ঘটা কূটনৈতিক তৎপরতার বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দিক প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আনেন:
- অচলাবস্থা নিরসন: শান্তি আলোচনা যখনই কোনো বড় ধরনের অচলাবস্থার মুখে পড়েছে, তখনই পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনির উভয় পক্ষের সাথে সক্রিয় যোগাযোগ ও সমন্বয় চালিয়ে গেছেন।
- যুদ্ধের বিস্তার রোধ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভয়াবহ বিস্তার ঠেকাতে সেনাপ্রধান দিন-রাত কাজ করেছেন এবং তিনি কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়েননি বলেই এই কঠিন শান্তি প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল।
- কখনো হাল না ছাড়ার কূটনীতি: অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যখন মনে হচ্ছিল আলোচনা পুরোপুরি থেমে যাবে। সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক জওহর সেলিমের মতে, আস্থার সংকট কাটাতে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল ‘কখনো হাল না ছাড়ার কূটনীতি’র এক অনন্য উদাহরণ।
- সহযোগীদের ভূমিকা: প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ অবদানের জন্য পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং তাঁর কূটনৈতিক দলের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে তিনি কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও চীনের নেতাদেরও তাঁদের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান।
চুক্তির রূপরেখা ও ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক
রোববার (১৪ জুন) রাতে দুই দেশের কর্মকর্তারা যুদ্ধের অবসান ও সমঝোতার ঘোষণা দেওয়ার পর সোমবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (X) প্রথম এই যুদ্ধবিরতির খবর জানান শেহবাজ শরিফ। এর কিছুক্ষণ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে লেখেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’
ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) পাকিস্তানের আয়োজনে জেনেভায় এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা রয়েছে। ১৪ দফা বিশিষ্ট এই সমঝোতা স্মারকের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
| চুক্তির প্রধান শর্তসমূহ | বাস্তবায়নের সময়সীমা ও বিবরণ |
| নৌ অবরোধ প্রত্যাহার | চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেবে। |
| সৈন্য ও সামরিক শক্তি অপসারণ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের অঞ্চলগুলোতে মোতায়েন করা তাদের সমস্ত সামরিক বাহিনী ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। |
| হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ | সংঘাতের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া কৌশলগত হরমুজ প্রণালী আবার আন্তর্জাতিক সাধারণ নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। |
| ইরানি সম্পদ মুক্তি | দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে জব্দ বা স্থগিত থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ইরানি সম্পদ ধাপে ধাপে মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। |
| পরমাণু কর্মসূচি অন্তর্ভুক্তকরণ | চুক্তির পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি আপাতত এই আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। |
ইরানের নতুন নেতৃত্ব ও সংকটের প্রেক্ষাপট
এই পুরো শান্তি আলোচনাটি পরিচালিত হয়েছে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির দূরদর্শী নেতৃত্বে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলার প্রথম দিন দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জাতীয় পরিষদে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন যে, এমন অত্যন্ত কঠিন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতেও মোজতবা খামেনি ‘অসাধারণ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের’ পরিচয় দিয়েছেন।
পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের উদ্যোগে প্রথম একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, যার মেয়াদ পরবর্তীতে ইসলামাবাদের বিশেষ অনুরোধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন। এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। পরবর্তীতে মে মাসে পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি তেহরান সফর করেন এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একাধিকবার ইসলামাবাদে এসে বৈঠক করেন। বহু চড়াই-উতরাই এবং শেষ মুহূর্তে বৈরুতে ইসরাইলি হামলার পর তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অবশেষে এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিটি আলোর মুখ দেখল।



















