সীমান্ত হত্যা, লাগাতার পুশইন (জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ) এবং দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বুধবার (১০ জুন) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে উল্টো ভারতীয় মন্ত্রীদের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি হিসেবে শোনাচ্ছে। সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে ভিনদেশের স্বার্থ চরিতার্থ করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই পরিস্থিতি ও সীমান্ত আগ্রাসনের প্রতিবাদে আগামী ১২ জুন থেকে দেশজুড়ে নতুন রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় জোট।
সীমান্ত হত্যা ও পুশইন নিয়ে ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ:
- মানবাধিকার লঙ্ঘন: তিনি বলেন, “প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে প্রতিবেশীর মতো আচরণ করছে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশের মানুষকে সীমান্তে সরাসরি গুলি করে হত্যার বিধান নেই; এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন।”
- পুশইনের পরিসংখ্যান: জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে অন্তত অর্ধশতাধিক সফল পুশইনের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রায় দেড় হাজারেরও বেশিবার জোরপূর্বক পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
- জনগণের প্রতিরোধ: বিজিবি এবং দেশের সাধারণ দেশপ্রেমিক জনগণের যৌথ ও সাহসিক ভূমিকার কারণেই মূলত এবার সীমান্তে বড় ধরনের বিপর্যয় রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যেকোনো মূল্যে পুশইনের এই অপতৎপরতা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও political হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়:
- মামলার পাহাড়: জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত মাত্র তিন মাসে সারা দেশে মোট ফৌজদারি মামলার সংখ্যা রেকর্ড ৫১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের নাজুক আইনশৃঙ্খলার প্রমাণ।
- রাজনৈতিক সহিংসতা: হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, এই সময়ে বিএনপি নিজেদের দলীয় কোন্দলে ১৮ জন নেতা-কর্মীকে খুন করেছে। এছাড়া জামায়াতেরও ৪ জন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে সরকারের নীরবতাই প্রমাণ করে তারা এর পরোক্ষ মদতদাতা।
সরকারের ১০০ দিন ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সমালোচনা
বর্তমান সরকারের শাসনব্যবস্থা ও সংস্কারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াত নেতা বলেন, এই সরকারের প্রথম ১০০ দিনের দেশ পরিচালনায় জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা, নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সরকার এখন অতীতের ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ পরিচালনা করছে এবং তারা যে আসলে কোনো প্রকৃত সংস্কার চায় না, তা ধাপে ধাপে প্রমাণিত হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জাতির যে রাজনৈতিক ও constitutional সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল, তা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপির কেউ কেউ জনগণের সেই কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ হতে দেয়নি। তাঁর মতে, বিএনপি জনগণের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কারের শপথ লঙ্ঘন করেছে, যেখানে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত দুটি শপথই অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করেছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘নতজানু’ নীতি প্রত্যাখ্যান ও বিজিবি শক্তিশালীকরণের তাগিদ
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সীমান্ত সংক্রান্ত বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন:
- মানবেতর জীবন: সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) পুশইনের শিকার হয়ে আটকে থাকা মানুষ বর্তমানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে, যেখানে সরকারের ত্রাণ বা কূটনৈতিক ভূমিকা একেবারেই অপ্রতুল।
- নতজানু কূটনীতি: পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই ‘নতজানু’ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে অবিলম্বে দেশের স্বার্থে কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান তিনি। একই সাথে তিনি পুশইন প্রসঙ্গে সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানের দেওয়া বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন এবং পুশইন মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সামরিক ও কৌশলগতভাবে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন।
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ১১ দলীয় জোটের নতুন কর্মসূচি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করে এনসিপি নেতা বলেন, সরকারের একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। এই অভ্যন্তরীণ সংকট এবং সীমান্ত আগ্রাসনের প্রতিবাদে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে রাজপথে আন্দোলনের তৃতীয় ধাপের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে:
- ১২ জুন: দেশের প্রতিটি সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে একযোগে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
- ১৫ জুন: একযোগে বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে বড় ধরনের সমাবেশ এবং রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও কেন্দ্রীয় সমাবেশ করা হবে।
জোটের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, জাতীয় সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথেও তাদের এই আন্দোলন দেশ ও জনগণের স্বার্থে সমান্তরালভাবে চলমান থাকবে।



















