শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র সামনে আসছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের পর বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে লাভবান হচ্ছে কয়েকটি কোম্পানি, অথচ চরম চাপের মুখে পড়ছে দেশের অর্থনীতি।
খুলনার খালিশপুরে ২৩০ মেগাওয়াটের একটি ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র গত দুই বছরে এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি, অথচ বছরে ২০০ কোটির বেশি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে ঘোড়াশালের রিজেন্ট, বাগেরহাটের মধুমতি, বরিশালের সামিট, মেঘনাঘাটের ওরিয়নসহ একাধিক কেন্দ্র সক্ষমতার ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও মাসে কোটি কোটি টাকা নিচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এর বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র আসার পর এসব কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা কমে গেলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে নিয়মিত।
২০১০ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সরকার বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় করেছে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জেই গেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকেই অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
প্যারামাউন্ড-বাংলাট্রেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরকারকে কিনতে হয়েছে প্রায় ৮৫ টাকায়, যেখানে পিডিবি গড়ে বিক্রি করে মাত্র ৬ টাকার একটু বেশি দামে। পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি নিয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে দিনের আলোতেই ডাকাতি হয়েছে। যেসব কেন্দ্র সক্ষমতার ৪০ শতাংশের নিচে বিদ্যুৎ দেয়, সেগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। তবুও ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে টাকা লুট করা হয়েছে।”
বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খান জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের স্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে এবং সরকার শিগগিরই অন্তত একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি আইপিপিগুলোকে বিদ্যুতের দাম কমাতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে।
দুদক ও বিদ্যুৎখাত পর্যালোচনা কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং পিডিবির কিছু সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, পরিকল্পনাহীন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, বিশেষ আইনের অপব্যবহার এবং প্রতিযোগিতাহীন ট্যারিফ নির্ধারণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে কয়েকটি কোম্পানির জন্য ‘টাকার মেশিনে’ পরিণত করা হয়েছিল—যার বোঝা আজ বহন করছে পুরো দেশের অর্থনীতি।



















