দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক ভাবমূর্তি বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুর, সন্ত্রাস বা অন্য কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দলটি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা দখলদারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পর কয়েকজনকে বহিষ্কার এবং বিভিন্ন কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে চলমান রয়েছে।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে অনৈতিক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে।
২৯ সেপ্টেম্বর পল্লবীর ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোফিজুর রহমান মামুনকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম বা অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাকে সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পুলিশের একজন কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনিয়মের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। জাতীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীও দলীয় পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও দখলের ঘটনাগুলোতে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দলীয় পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক পরিচয়ের কারণে ছাড় দেওয়া হবে না—এমন বার্তাই এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সামনে আসছে। ফলে অভিযোগের ক্ষেত্রে দলীয় তদন্ত, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


















