দেশের সামগ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক (ইভি) বাস চালুর এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই রূপান্তরকে দেশব্যাপী সফল করতে সারাদেশে একটি সার্বজনীন ইভি চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং মেট্রোরেলের বিকল্প হিসেবে কিছু রুটে মনোরেল চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানান, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলতেই এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক বাস বহর গড়ে তুলতে সরকার বর্তমানে একাধিক সমান্তরাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে ৫০০টি ইভি বাস কেনার একটি প্রস্তাব অর্থায়নের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ৩০০টি বৈদ্যুতিক বাসের একটি চলমান প্রকল্পকে আরও বড় করার লক্ষ্যে সংশোধনের কাজ চলছে এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আরও ৪০০টি বাস কেনার একটি প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সড়ক পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক বাস ক্রয়ের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে সরকার ইতিমধ্যে ৪০০ কোটি টাকা করে দু’টি পৃথক বিশেষ ক্রয় প্যাকেজ যুক্ত করেছে। সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, এই কর্মসূচির আওতায় নারী যাত্রীদের যাতায়াত নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে একটি বিশেষ বাস বহর থাকবে, যেখানে বাসের সংখ্যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১০০টিরও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। সচিব আশা প্রকাশ করে বলেন, সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের গণপরিবহনে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস যুক্ত হবে, যার দৃশ্যমান প্রভাব চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে দেশের নির্বাচিত কিছু প্রধান রুটে দেখা যাবে। প্রাথমিকভাবে অন্তত ২০০টি বাস নামানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এই ইভি বিপ্লবকে সফল করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি বাসের ব্যাটারি, চার্জিং প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক সহায়তার জন্য একটি অভিন্ন ও সার্বজনীন কারিগরি মানদণ্ড প্রণয়ন করছে, যা পরবর্তীতে বৈদ্যুতিক মিনিবাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হবে।
এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশন (বিআরটিসি) দেশের ৬৪টি জেলায় তাদের নিজস্ব জমিতে আধুনিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এই স্টেশনগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে উন্মুক্ত রাখা হবে, যাতে বেসরকারি অপারেটররাও বাণিজ্যিকভাবে এগুলো ব্যবহার করতে পারেন। সচিব আরও জানান, যেসব রুটে মেট্রোরেল নির্মাণ করা সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প নয়, সেখানে বিকল্প আধুনিক গণপরিবহন হিসেবে ‘মনোরেল’ চালুর সম্ভাবনা ও রুট যাচাইয়ের দায়িত্ব বুয়েট-কে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা নিয়েও একটি সমন্বিত উপস্থাপনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশ এখনও ইভি প্রযুক্তিতে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তাই বেসরকারি বাস মালিকদের এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সরকার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর ছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে অনেক বেসরকারি অপারেটর বিনিয়োগের আগে বিআরটিসির বাসের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে চাইছেন। অন্যদিকে, ইভি প্রযুক্তির উচ্চ ব্যয় এবং যাত্রীদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়া—এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি ব্যবস্থা ও ভাড়ার যৌক্তিক কাঠামো নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ড. জিয়াউল হক বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণ এবং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ পরিবহনের অন্যান্য বৃহত্তর সমস্যাগুলো সমাধানের কাজও সমানতালে অব্যাহত রাখবে।


















