বিগত গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে কূটনৈতিক কোনো ঘাটতি নেই বলে দৃঢ় দাবি করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সেইসঙ্গে সম্প্রতি ভারত থেকে নিজের দেশে ফেরার সময়কাল নিয়ে শেখ হাসিনা যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিকে সম্পূর্ণ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন তিনি। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই, ২০২৬) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে আলাপকালে তিনি সরকারের এই অনড় অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফেরার কথা বলছেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখ করছেন, তাহলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরাতে বাধা কোথায়?
‘আসামি কী বলছেন তা একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়’
সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সরাসরি বলেন:
- সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি: “বাংলাদেশের স্বাধীন আদালত একজনকে সুনির্দিষ্ট অপরাধে সাজা দিয়েছে। তিনি একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি, যিনি বাংলাদেশে বহু বছর ধরে অন্যায়, অত্যাচার ও নানাবিধ কুকর্ম করে বর্তমানে বিচার থেকে বাঁচতে বিদেশে পালিয়ে আছেন।”
- বক্তব্যের আইনি মূল্য নেই: তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “এমতাবস্থায় শেখ হাসিনা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বা বিভ্রান্তি ছড়াতে বাইরে বসে কী বলছেন বা না বলছেন, সেটা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়, বিন্দুমাত্র প্রাসঙ্গিক নয়।”
বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলমান
প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন:
- দ্বিপাক্ষিক চ্যানেল সচল: বর্তমান নির্বাচিত সরকারও ভারতের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সেই পূর্ববর্তী কূটনৈতিক চ্যানেল পূর্ণ শক্তিতে চলমান রেখেছে। আমরা সম্পূর্ণ সঠিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে তাঁকে হস্তান্তরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
- প্রটোকল ও জন-আকাঙ্ক্ষা: দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ‘বন্দি বিনিময় চুক্তি’ (Extradition Treaty) এবং আন্তর্জাতিক আইনগত যে প্রটোকল বা নর্মস (মানদণ্ড) রয়েছে, সেটি কঠোরভাবে অনুসরণ করেই এই আসামিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হবে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণও রাস্তায় নেমে এই স্বৈরাচারের বিচারই দেখতে চায়।
স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয়
শামা ওবায়েদ আরও যোগ করেন, বিগত শাসন আমলে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ অন্যায়, মেগা দুর্নীতি, নির্বিচারে খুন এবং গুমের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর একটি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ বিচার বাংলাদেশের মাটিতে নিশ্চিত করা হবে। এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি কেবল এককভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়েরও সমান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
| মন্ত্রণালয়ের নাম | প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ভূমিকা ও কর্মপরিকল্পনা |
| পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় | ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক লিয়াজোঁ ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল রক্ষা করা। |
| স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় | বন্দি বিনিময় চুক্তির প্রশাসনিক নথিপত্র তৈরি ও রেড নোটিশ সংক্রান্ত কাজ। |
| আইন মন্ত্রণালয় | আদালতের রায়, পরোয়ানা এবং আইনি জটিলতা বা ফাঁকফোকরগুলো খুঁটিয়ে দেখা। |
ভারতের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণে কোনো ধরণের আইনি জটিলতা বা অনীহা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, “আইনি কোনো জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতা আছে কি নাই, সেটি আইন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখবে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক ও দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া চালানো দরকার, তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চালানো হচ্ছে। সেখানে আমি অন্তত কোনো প্রকার ঘাটতি বা শৈথিল্য দেখছি না।”



















