গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও শিশুদের ওপর একই ধরনের যুদ্ধাপরাধ চালানো হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে কমিশনের নতুন প্রতিবেদনে। ইসরায়েল এই প্রতিবেদনকে ‘মানহানিকর প্রহসন’ ও ‘মিথ্যা প্রচার’ আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গাজায় ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের সচেতন কৌশল
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ কর্তৃক ২০২১ সালে গঠিত এই তিন সদস্য বিশিষ্ট স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল (যারা জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র নন) তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ‘ইচ্ছাকৃতভাবে হাজারো ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু, তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে’। কমিশনের মতে, এসব কর্মকাণ্ড মূলত ‘গাজায় ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার একটি সচেতন কৌশলের অংশ, যেখানে তাদের শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে’।
কমিশনের চেয়ারম্যান ভারতীয় বিচারবিদ শ্রীনিবাসন মুরালিধর জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও এই হত্যাকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন অব্যাহত ছিল। তিনি বলেন, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ইসরায়েল মূলত ফিলিস্তিনি জাতির অস্তিত্ব বজায় রাখার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতার ওপরই সরাসরি আঘাত করছে।
ড্রোন ও স্নাইপার দিয়ে হামলা, নির্যাতন ও অনাহারের কৌশল
প্রতিবেদনে ইসরায়েলি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিগত ধরন তুলে ধরা হয়েছে:
- নিখুঁত অস্ত্রের ব্যবহার: শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোয়াডকপ্টার ড্রোনের মতো নিখুঁত অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে এবং স্নাইপার ব্যবহার করে সরাসরি গুলি চালানো হয়েছে। এছাড়া আবাসিক ভবন, স্কুল ও বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমাবর্ষণ করা হয়েছে।
- চিকিৎসা ও শিক্ষা ধ্বংস: গাজায় নবজাতক ও শিশু হাসপাতালগুলোর ওপর পদ্ধতিগত হামলা চালিয়ে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার পথ বন্ধ করা হয়েছে এবং স্কুলে হামলার মাধ্যমে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নষ্ট করা হচ্ছে।
- অনাহার ও অপুষ্টি: যুদ্ধের কৌশল হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার করা এবং মানবিক সাহায্যে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে শিশুদের মধ্যে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি সৃষ্টি করা হয়েছে।
- কারাগারে অমানবিক নির্যাতন: গাজা ও পশ্চিম তীরের শিশুদের, বিশেষ করে কিশোর ছেলেদের গ্রেপ্তার করে ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রে অমানবিক নির্যাতন এবং বিশেষত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার করার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।
হতাহতের খতিয়ান ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হওয়ার পর ইসরায়েল এই সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে (যা জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য মনে করে), এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৩ হাজার ৩৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ জনের বেশি শিশু। গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে এবং এই যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী সময়েই অন্তত ১,০২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৬৫ জনই শিশু। পক্ষান্তরে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে এই সময়ে তাদের চারজন সৈন্য নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের তীব্র প্রত্যাখ্যান ও আইনি লড়াই
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি একটি মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য সত্য অনুসন্ধান না করে শুধু ইসরায়েলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। তাদের দাবি, প্রতিবেদনটিতে হামাসের হাতে নিহত ও অপহৃত ইসরায়েলি শিশুদের বিষয় এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়গুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি নেতারা বরাবরই গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে ‘আত্মরক্ষা’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বেসামরিক ক্ষতি কমানোর অভিযান বলে দাবি করছেন।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা একটি মামলার শুনানি চলছে, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এই মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।



















