প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে. এই লক্ষ্যমাত্রাটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার (৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি. তবে অর্থনীতিবিদ এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে.
রাজস্ব আদায় নিয়ে সিপিডি ও অর্থনীতিবিদদের সংশয়
বাজেটের আয়ের লক্ষ্যমাত্রাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থাগুলো বেশ কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন:
- বাস্তব প্রবৃদ্ধির ব্যবধান: সরকার কাগজ-কলমে ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বললেও সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাস্তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে রাজস্ব আদায়ে ৫৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে.
- চলতি অর্থবছরের চিত্র: চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা. বছরের বাকি ৩ মাসে (এপ্রিল-জুন) আরও ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় হলেও বছর শেষে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায় করা কঠিন হবে. ফলে নতুন বছরের লক্ষ্যমাত্রাটি অবাস্তব ঠেকছে.
- কর-জিডিপি অনুপাত: বর্তমানে দেশে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ, যা প্রস্তাবিত বাজেটে ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে; যাকে অর্থনীতিবিদরা অবাস্তব বলে মনে করছেন.
- ড. মোস্তফা কে. মুজেরীর মতামত: বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, অর্থনীতির আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও মূল সমস্যা সক্ষমতার. রাজস্ব আদায় কম হলে সরকারকে বাজেট বাস্তবায়নে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে অথবা বাজেট বাস্তবায়নই করা যাবে না. তবে আয়ের বিকল্প নেই.
অর্থায়নে সরকারের ত্রিমুখী ব্যবস্থা ও ঋণ নীতি
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্বীকার করেছেন যে আয়ের খাতগুলো দুর্বল. তবে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকার মূলত একটি ত্রিমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে—রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন ব্যয় হ্রাস.
| খাতের নাম | সরকারের কৌশল ও নীতিগত অবস্থান |
| অর্থনীতি সচলকরণ | করের হার না বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে করপোরেট কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যা ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করার স্বীকৃত পদ্ধতি. |
| ক্যাশলেস সোসাইটি | দেশের অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) অর্থনীতিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ফরমাল বা মূল ধারায় আনা হবে। দুর্নীতি কমাতে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে. |
| কঠোর ঋণ নীতি | পতিত সরকারের আমলে বৈদেশিক ঋণ ৩২২% বৃদ্ধি পাওয়ায় সুদের বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে. তাই বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যেখানে সুনির্দিষ্ট রিটার্ন বা বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব (Investment Multiplier Effect) নেই, সেখানে নতুন কোনো ঋণ নেওয়া হবে না. |
| ব্যয় সংকোচন | প্রশাসনের সামঞ্জস্যহীন ব্যাপ্তি এবং পুঞ্জীভূত ঋণের কারণে বেড়ে যাওয়া পরিচালন ব্যয় আস্তে আস্তে কমিয়ে আনা হবে. |
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকারের ছয়টি মূল কৌশল
অতীতের কর ফাঁকি, তথ্য গোপন এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা দূর করে আয় বাড়াতে প্রস্তাবিত বাজেটের বক্তৃতা ও অর্থবিলে প্রধানত ছয়টি কৌশল ঘোষণা করা হয়েছে:
- ১. কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর: কর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনা হবে. করদাতাদের হয়রানি কমাতে কর কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হচ্ছে এবং অর্থবিলে অনুমোদিত ডিজিটাল সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হিসাবকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা লেনদেন নজরদারি সহজ করবে.
- ২. করনীতি ও প্রশাসনের পৃথকীকরণ: রাজস্ব ব্যবস্থার বড় সংস্কার হিসেবে করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসন পরিচালনার কাজকে আলাদা করা হচ্ছে. এর ফলে করনীতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং আদায়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে.
- ৩. কর নেট সম্প্রসারণ: অর্থ আইনে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে. ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং মার্চেন্ট এমএফএস (MFS) অ্যাকাউন্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিআইএন (BIN) ব্যবহার করতে হবে.
- ৪. ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা: কর ফাঁকি প্রতিরোধে আয়কারী গোয়েন্দা ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষমতা অনেক বাড়ানো হয়েছে. তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র যাচাই ও তল্লাশির পরিধি বিস্তৃত করার মাধ্যমে বিদ্যমান করদাতাদের ফাঁকি রোধ করে নতুন কর ছাড়াই রাজস্ব বাড়ানো হবে.
- ৫. পরোক্ষ কর থেকে আয় বৃদ্ধি: বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ডিজিটাল সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে. পাশাপাশি আমদানিকৃত ফল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কোমল পানীয় এবং তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চ সম্পূরক শুল্ক বহাল বা বৃদ্ধি করা হয়েছে.
- ৬. ‘থ্রি আর’ (3R) কৌশল: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়াতে ‘রিকভারি, রেস্ট্রোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন’ (ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উৎপাদন-বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ) কৌশল নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আয় বাড়াবে.



















