জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ৫টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় সংসদের বৈঠক শুরু হলে প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এই তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় জনগণকে এই বিশেষ কার্ড প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ই-হেলথ কার্ড ও পাইলট জেলাসমূহ
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নতুন এই ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা কার্ডের কার্যকারিতা ও কোন কোন জেলায় এটি প্রথম চালু হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন:
- প্রাথমিক ৫টি জেলা: প্রথম ধাপে ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ৫টি জেলা যথাক্রমে—খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীর সাধারণ মানুষকে এই ই-হেলথ কার্ড সেবা প্রদান করা হবে।
- ডিজিটাল স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক: এই আধুনিক ই-হেলথ কার্ডটি সরাসরি ‘ইলেক্ট্রনিক রিফারেল সিস্টেম’ এবং ‘ইলেক্ট্রনিক পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’-এর সাথে সার্বক্ষণিক সংযুক্ত থাকবে, যার ফলে রোগীদের চিকিৎসার ইতিহাস ও ব্যবস্থাপত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিসমূহ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চলমান ১৮০ দিনের কর্মসূচির বিভিন্ন খাতের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংসদে বিশদভাবে তুলে ধরেন:
- নারী প্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড: পাইলটিং পর্যায়ের অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত দেশের ৩৬টি ইউনিটের ৬০ হাজার ৪৪টি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে, যেখানে পরিবারের নারী প্রধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
- কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফ: দেশের ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৭৪৮ জনকে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষিঋণ মওকুফ করেছে সরকার।
- ধর্মীয় উপাসনালয়ে সম্মানী ভাতা: দেশের ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির, ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহার-প্যাগোডা এবং ৩৯৬টি গির্জায় কর্মরত ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গকে (ইমাম, পুরোহিত ও যাজক) সরকারি তহবিল থেকে মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে এই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
- খাল খনন ও জলাশয় সংস্কার: পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সারাদেশে ৬৬৬টি খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। খননকৃত এই খালের মোট দৈর্ঘ্য ৯৬৫.০৪ কিলোমিটার।
- সবুজ কর্মসংস্থান ও বৃক্ষরোপণ: দেশে মোট ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবান্ধব সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে দেশজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ চারা রোপণ করা হবে।
- প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন: আগামী অর্থবছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের ডিজিটাল কার্যক্রমে দক্ষ করতে বিভিন্ন স্কুলে পর্যায়ক্রমে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
- শিক্ষার্থীদের জন্য জামানতবিহীন উচ্চশিক্ষা ঋণ: বিদেশে ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জামানতবিহীন সরকারি ঋণের সীমা ৩ লাখ টাকা হতে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বিশেষ করে জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়ার আগেই ‘সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি’ (COE)-র ভিত্তিতে এই ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি: ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে মোট ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
- ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে ‘নতুন কুঁড়ি’: ১২-১৪ বছরের কিশোর-কিশোরীদের সুপ্ত ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই বিশেষ কার্যক্রমে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্টসহ মোট ৮টি জনপ্রিয় খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।



















