আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বুধবার (১০ জুন) ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান. অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দেন. অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় ২০২৫ সালে সুদানে শাহাদাতবরণকারী ৬ সেনাসদস্যের স্ত্রীর হাতে বিশেষ সম্মাননা পদক তুলে দেন. একই সাথে ওই হামলাসহ সম্প্রতি বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে দায়িত্ব পালনকালে আহত সশস্ত্র বাহিনীর বীর সদস্যদের হাতেও তিনি সম্মাননা তুলে দেন এবং বিভিন্ন দেশে কর্মরত শান্তিরক্ষীদের সাথে ভার্চুয়ালি কুশল বিনিময় করেন.
বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ও নারী সদস্যদের গৌরব
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অনন্য ও দীর্ঘমেয়াদি অবদানের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে:
- মিশনের ইতিহাস: এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর ২ লাখেরও বেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩টি দেশে প্রায় ৬৩টি সফল মিশনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন.
- বর্তমান অবস্থান: বর্তমানেও ৪ হাজার ২১২ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৯টি আন্তর্জাতিক মিশনে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন এবং হাইতিতে সম্পূর্ণ নতুন একটি মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে.
- নারী শান্তিরক্ষীদের অবদান: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্যের সাহসী অংশগ্রহণের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী. তিনি উল্লেখ করেন, নারী সদস্যদের এই সক্রিয়তা ও বীরত্ব বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে.
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শৃঙ্খলা ও চেইন অফ কমান্ডের গুরুত্ব
সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক গৌরবময় অধ্যায় স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক এবং সেনাবাহিনীর একজন মেজরই (শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন. এই গৌরবকে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনন্ত প্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাহিনীর পেশাদারিত্ব, ঐক্য ও শৃঙ্খলার ওপর কঠোর তাগিদ দেন:
- ঐতিহাসিক ঐক্য: তিনি বলেন, অতীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আসা সর্বগ্রাসী আঘাতসহ সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাহিনীকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে.
- শৃঙ্খলা বজায় রাখা: ইউনিফর্মধারী বাহিনীর জন্য প্রফেশনালিজম (পেশাদারিত্ব), ইউনিটি (ঐক্য), ডিসিপ্লিন (শৃঙ্খলা) এবং চেইন অফ কমান্ড বজায় রাখা অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক বলে তিনি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন.
বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও বাহিনী আধুনিকায়ন
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ও প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রযুক্তির চরম উন্নয়নের ফলে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বহুমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে:
- নতুন বিশ্ব সংকট: প্রথাগত সম্মুখ যুদ্ধের বাইরে এখন সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অপব্যবহার, আন্তর্জাতিক মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির প্রধান নতুন অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে.
- আধুনিকায়নের উদ্যোগ: এই আধুনিক ও জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে বর্তমান সরকার সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে পর্যায়ক্রমিক ও যুগোপযোগী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে.
পররাষ্ট্রনীতি ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার
বাংলাদেশের মূল পররাষ্ট্রনীতি ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সবসময় প্রতিটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদার নীতিতে গভীরভাবে বিশ্বাস করে. সংবিধানে ব্যক্ত হওয়া বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সহ-অবস্থানের প্রতি দেশ সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ. বাংলাদেশ যেকোনো ধরনের বৈশ্বিক আগ্রাসন ও সংঘাতের বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং জাতিসংঘের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থাকবে.
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস ২০২৬ উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশেষ ও মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীসহ বিভিন্ন দেশের বিদেশি কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন.



















