মাদারীপুর শহরের একটি ভাড়াটে ফ্ল্যাট বাসা থেকে মা-বাবা ও তাঁদের আট মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তানের রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এক চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভালোবাসার টানে নিজের মুসলিম ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম মতে চিন্ময় শিকদারকে বিয়ে করেছিলেন ইসরাত জাহান সাউদা। তবে অভাব-অনটন, স্ত্রীর ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং ঋণের চরম মানসিক হতাশা থেকে শেষ পর্যন্ত তিনটি মরদেহের স্তূপে পরিণত হলো তাঁদের ভালোবাসার সেই সংসার। আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে মাদারীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে ঘটনার এই নেপথ্য কারণগুলো সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়।
প্রেমের সম্পর্কের জেরে ধর্মান্তর ও বিয়ে: পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ঢাকার উত্তরার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সময় নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা গ্রামের এরশাদ মিয়ার মেয়ে ইসরাত জাহান সাউদার সঙ্গে মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব কলাগাছিয়া এলাকার চিন্ময় শিকদারের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে দুই পরিবারের তীব্র অমত ও সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে ইসরাত নিজের ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু ধর্ম মতে চিন্ময়কে বিয়ে করেন এবং তাঁর নতুন নাম রাখা হয় ‘ইশা’। বিয়ের শুরুতে তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের হলেও খুব দ্রুতই তাঁদের সংসারে নেমে আসে অভাব-অনটন, রোগব্যাধি ও নানামুখী পারিবারিক দুশ্চিন্তা।
ঘটনার পরিক্রমা:
┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐
│ প্রেম ও ধর্মান্তরিত বিয়ে │ ───> │ চিকিৎসার পেছনে বিপুল ঋণ │ ───> │ চরম হতাশা থেকে হত্যাকাণ্ড│
└─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘
আইসিইউর ব্যয়বহুল খরচ ও ঋণের বোঝা: মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ এবং চিন্ময়ের পারিবারিক সূত্র জানায়, ইশা দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত (অ্যাজমা) রোগে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) ভর্তি করা হয়, যেখানে প্রতিদিনের চিকিৎসা খরচ ছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসায় প্রায় ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও দেনাদার হয়ে পড়েন চিন্ময়। একদিকে চড়া সুদের ঋণের চাপ, অন্যদিকে স্ত্রীর অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন।
৯৯৯-এ ফোন ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা: মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক ভাবনা জানান, গত রবিবার (১৭ মে) বিকেলে চিন্ময় ঢাকা থেকে তাঁর স্ত্রী ইশা ও আট মাসের কন্যাসন্তানকে নিয়ে মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকায় তাঁর সৎ মায়ের ভাড়া বাসায় আসেন। রাতে খাবার খেয়ে তাঁরা একটি রুমে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন। গভীর রাত পর্যন্ত ওই ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে চিন্ময়ের সৎ মা মিষ্টি বাড়ৈ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন। পরে গতকাল সোমবার ভোরে সদর থানা পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে ঘরের ভেতর থেকে ইশার মরদেহ বিছানায় এবং ফ্যানের সঙ্গে চিন্ময় ও তাঁর আট মাসের কন্যাসন্তানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ঋণের বোঝা ও মানসিক হতাশা সহ্য করতে না পেরে চিন্ময় প্রথমে তাঁর স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন এবং পরে কন্যাসন্তানকে সাথে নিয়ে নিজে আত্মহননের পথ বেছে নেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।



















