যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাতকড়া ও পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় ফেরত পাঠানো বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ৩১ জন বাংলাদেশি। তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিকল পরিয়ে রাখা, চলাচলে বাধা দেওয়া এবং অমানবিক আচরণের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
ফেরত আসাদের একজন, ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম), বিবিসি বাংলাকে জানান, “বাংলাদেশে নামার আগ পর্যন্ত ৭৫ ঘণ্টা আমার হাত–পায়ে শিকল ছিল। বাথরুমেও যেতে দেয়নি। পুরো শরীর দাগে ভরা।” পাঁচ বছর আগে বলিভিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে বৈধ হওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি, কিন্তু আশ্রয়ের আবেদন ও ওয়ার্ক পারমিটের তিন দফা প্রচেষ্টাও বিফল হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, অ্যাটর্নি পরিচয়ে বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি চক্র সেখানে সক্রিয়। ছয় মাস আগে নিউইয়র্কে আটক হওয়ার পর তাঁকে বাফেলো থেকে লুইজিয়ানার আরেক ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়—হাতে ও পায়ে শিকল পরিয়ে। সেখানে অমানবিক খাবার ও পরিবেশে তাঁকে থাকতে হয়।
আরেক ফেরতপ্রাপ্ত জানান, “হাতে, গলায়, কোমরে শিকল। রাত ১২টা থেকে শিকল পরানো—সকাল ৮টায় বিমানে তোলে। এরপর ২৭–২৮ ঘণ্টা বাথরুমেও যেতে দেয়নি।”
ফ্লাইটে থাকা অধিকাংশই নোয়াখালীর বাসিন্দা, পাশাপাশি সিলেট, ফেনী, কুমিল্লা, শরীয়তপুরের মানুষও ছিলেন। অনেকেই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কারাগারে আরও বাংলাদেশি আটক আছেন এবং তাঁদেরও ফেরত পাঠানো হতে পারে।
একজনের ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ভাইয়ের জন্য ৩৫ লাখ খরচ করছি, এখন কী হবে? ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে ব্রাজিল গিয়েছিল, তারপর দালালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করে ধরা পড়ে।”
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্যমতে, গত সাত মাসে ২৫০ জনের বেশি বাংলাদেশিকে এভাবে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “ফেরত পাঠানো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু ৫০–৬০ ঘণ্টা হাত–পায়ে শিকল লাগিয়ে রাখা অমানবিক। সরকারকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।” তিনি আরও বলেন, যারা ব্রাজিল যেতে ছাড়পত্র দিয়েছিল বা অনিয়ম করেছে, তাদেরকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
অনিয়মের কারণে অতীতে বিদেশে শ্রমবাজার হারানোর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেন—আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার নতুন শ্রমবাজারের সুযোগ যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।



















