মঙ্গলবার , ১৫ জুলাই ২০২৫ | ২০শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

চ্যালেঞ্জে ১৪ হাজার কোটি টাকার পায়রা বন্দর

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
জুলাই ১৫, ২০২৫ ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নির্মিত পায়রা সমুদ্রবন্দর একদিকে যেমন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে, তেমনি এর বিশাল ব্যয় এবং ধীরগতি নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বন্দর থেকে আয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা। ২০৪৩ সালের মধ্যে এটিকে লাভজনক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনেকে এই বন্দরকে দক্ষিণ বাংলার অর্থনৈতিক উত্থানের সিঁড়ি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে “এক ব্যয়বহুল ভুল” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর চাপবে। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে এটি পুরোদমে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে এগোচ্ছে। তবে, এই বন্দরের ভবিষ্যৎ কতটা টেকসই, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


অবকাঠামোগত অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ

সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরের আধুনিক জেটি নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। আন্ধারমানিক নদীর ওপর প্রায় ১.২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতুও নির্মাণাধীন। বন্দরকে ঘিরে এরই মধ্যে স্থানীয়ভাবে দোকানপাট, হোটেল-মোটেল এবং পরিবহন ও নির্মাণ খাতে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে, যা একসময় জনশূন্য চরকে কর্মমুখর করে তুলেছে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী (জেটি) মোস্তফা আশিক আলী জানান, প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৬৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি এখন ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। সেতু ও মহাসড়কের কাজ শেষ হলে ঢাকার সাথে বন্দরের দ্রুত ও নির্বিঘ্ন সংযোগ স্থাপিত হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, “আমরা আগামী বছরের জুলাই থেকে পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করতে পারব। এখনই কয়লা ও পাথরের জাহাজ ভিড়ছে। খোলা পণ্য, গাড়িবাহী কার্গো—সব ধরনের হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রস্তুতি রয়েছে।”

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং আয় হয়েছে ২ হাজার কোটির বেশি। বর্তমানে চ্যানেলের গভীরতা ৬.৫ মিটারের বেশি, যেখানে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন মালবাহী মাদার ভেসেল ভিড়তে পারে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরতা ১০.৫ মিটারে উন্নীত করা গেলে এটি দেশের গভীরতম চ্যানেলে পরিণত হবে। ইতোমধ্যে দুটি হপার ড্রেজার কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, চ্যানেলে পলি জমার প্রবণতা থাকলেও, নিজস্ব ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু হলে প্রতি কিউবিক মিটার ড্রেজিংয়ের খরচ ২.৮৮ ইউরো থেকে ১.৬ ইউরোতে নেমে আসবে।

মোস্তফা আশিক আলী উল্লেখ করেন, ঢাকা থেকে নদীপথে পায়রা বন্দর সবচেয়ে সহজ ও কম খরচের পথ। এখানে জোয়ার-ভাটার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না এবং নদী স্বাভাবিকভাবেই গভীর।


নতুন প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সম্প্রতি পায়রা বন্দরের উন্নয়নে সরকার তিনটি নতুন প্রকল্পের জন্য ৫ হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং করে গভীরতা ১০.৫ মিটার বজায় রাখা হবে। ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় দুটি হপার ড্রেজার কেনা হবে। এছাড়া, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার জন্য ১৬১ কোটি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ৪৯০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

বন্দর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ডিআইএসএফ প্রকল্পের আওতায় প্রশাসনিক ভবন, সড়ক, পুনর্বাসন এলাকা এবং জেটি নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। পিপিএফটি প্রকল্পে মাল হ্যান্ডলিং, টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের কাজ চলছে। এই দুটি প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৫ থেকে ৯৩ শতাংশ। তবে, দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, এলএনজি টার্মিনাল, রেল সংযোগ, শিপ রিপেয়ার ফ্যাসিলিটিসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে। কিছু মোবাইল হারবার ক্রেন, ট্রেইলার, ট্রাক্টরসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম ইতোমধ্যে বন্দরে এসে পৌঁছেছে।


বিশেষজ্ঞ মতামত ও পরিবেশগত উদ্বেগ

তবে, অর্থনীতিবিদ ড. মঈনুল ইসলাম পায়রা বন্দরকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি মনে করেন, এটি একটি নদীবন্দর হিসেবেই থাকবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প বানাতে গিয়ে সরকার অযৌক্তিক অপচয়ে জড়িয়েছে। তার মতে, কয়লা আমদানিতে কিছু কাজ হলেও, বড় জাহাজ সরাসরি এখানে ভিড়তে পারবে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, বন্দরের নৌপথে বিভিন্ন স্থানে ৫ থেকে ১৫ মিটার গভীরতা থাকলেও, ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলকে কার্যকর রাখতে বছরে প্রায় ১০ কোটি কিউবিক মিটার পলি খনন করতে হবে, যার সম্ভাব্য খরচ ৮-১০ হাজার কোটি টাকা। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে এই চ্যানেল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।


বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, পায়রা বন্দরকে ঘিরে বৃহৎ পরিকল্পনা রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্বে দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল এবং একটি লিকুইড বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, ১ হাজার ২০০ একর জমিতে ৪০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা চলছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ২০৪৩ সালের মধ্যে পায়রা বন্দর লাভজনক হয়ে উঠবে এবং এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। এরই মধ্যে বসুন্ধরা, টিকে, প্রাণ-আরএফএল, মদিনা, এসিআইয়ের মতো দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো পায়রা বন্দরে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। চীন, জাপান, ডেনমার্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং কাতারসহ অনেক বিদেশি দেশও পায়রা বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহী বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ - অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত