ঢাকা, ১১ জুলাই, ২০২৫: বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং দেশে দ্রুত গণতান্ত্রিক উত্তরণ চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আওয়ামী লীগকে ‘অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী শক্তি’ এবং ‘এক ধরনের মাফিয়া সংগঠন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আওয়ামী লীগের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমার মতে, আওয়ামী লীগ আর কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তারা বহু আগেই তাদের আদর্শ ও চরিত্র হারিয়েছে। তারা এখন একটি অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী শক্তিতে, এক ধরনের মাফিয়া সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের আগ থেকে আজ পর্যন্ত তাদের ইতিহাসে কখনো গণতন্ত্র চর্চা হয়নি। গণতন্ত্র তাদের রক্তে নেই।”
আসন্ন নির্বাচন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচন ঘিরে যে দাবিদাওয়া তুলছে, তা তাদের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন যে, অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
জোট ও জাতীয় সরকার: জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “জামায়াত ইসলামীকে নিয়ে নির্বাচনী জোটের কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। অতীতে কৌশলগত কারণে আমরা জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছি, কিন্তু এবার তাদের সঙ্গে জোট গঠনের প্রয়োজন অনুভব করছি না।” তিনি জানান, বিএনপি এখন মূলত সেই দলগুলোর সঙ্গে জোট ও জাতীয় সরকার গঠনে মনোযোগী, যারা একযোগে আন্দোলনে এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। তিনি বলেন, “এখন এর বাইরে কিছু ভাবা হচ্ছে না।”
তরুণ রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে সম্ভাব্য জোট গঠন প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক জোট নিয়ে আলোচনা চলবে এবং কী হয় তা সময়ই বলে দেবে। তিনি আরও যোগ করেন, সব গণতান্ত্রিক দলই নির্বাচনের আগে নানা কৌশল গ্রহণ করবে এবং বিএনপি শেষ পর্যন্ত কী কৌশল অবলম্বন করে ও কার সঙ্গে জোট করে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
সংস্কার কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমার মনে হয়, এই আলোচনা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যেই আলোচনা শেষ হওয়া উচিত ছিল। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক পরিচালনায় কিছু ঘাটতি রয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে সময়সাপেক্ষ করে তুলছে। আশা করি, এই আলোচনা আর বেশি দিন চলবে না। এখন একটা সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দরকার।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এখন কেবল সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ রায়ের অপেক্ষা। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদনে ইতিবাচক রায় দেবে। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বাংলাদেশের জনগণ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন চায়। তবে, এই কাঠামোর রূপ কিংবা সাবেক প্রধান বিচারপতিকেই প্রধান উপদেষ্টা রাখার বিষয়টি নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে এবং বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপিসহ অন্যান্য দল এবং সংস্কার কমিশন তাদের প্রস্তাব দেবে। যদি আরও ভালো কোনো বিকল্পে একমত না হওয়া যায়, তবে বর্তমান কাঠামোই বহাল থাকবে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থার বিরোধিতা: আসন্ন নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার জন্য উপযোগী রাজনৈতিক, সামাজিক ও নির্বাচন সংস্কৃতি নেই। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, পিআর ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, ভোটদানে নিরুৎসাহিত হন এবং সংসদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি আরও বলেন, “আমাদের ভোটাররা তাদের পরিচিত ও স্থানীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পছন্দ করেন। কিন্তু পিআর ব্যবস্থায় এমনও হতে পারে যে, একটি এলাকায় কোনো দল বেশি ভোট পেলেও অন্য এলাকার কাউকে নির্বাচিত করা হয়। এটি জনগণের রায়কে প্রতিফলিত করে না, বরং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়।”



















