মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনে কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জোর প্রচেষ্টা চলার মাঝেই ইরানের অভ্যন্তরে আবারও নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং পারস্য উপসাগরে মাইন পাতার চেষ্টায় নিয়োজিত কয়েকটি ইরানি নৌযানকে লক্ষ্য করে এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে; যা মূলত ওই অঞ্চলে মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনা ও মিত্রদের সুরক্ষায় একটি অগ্রিম সতর্কতা। তবে এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরান পাল্টা দাবি করেছে যে, তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি অত্যাধুনিক দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরের আকাশে অনুপ্রবেশকারী একটি মার্কিন ‘শত্রু’ স্টেলথ ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের সমসাময়িক সময়ে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীও লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একাধিক বড় সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে নতুন করে প্রলয়ঙ্কারী বিমান হামলা চালিয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আবারও যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই চরম উত্তেজনা প্রশমন এবং একটি টেকসই সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক জটিল ও গোপনীয় পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, যেখানে ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির শীর্ষ পরমাণু আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে চলমান এই শান্তি আলোচনায় কিছু কারিগরি বিষয়ে সামান্য অগ্রগতি হলেও দ্রুত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি বা সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত খুবই কম বলে স্পষ্ট মনে করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই আলোচনা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বাইডেন-ট্রাম্প প্রশাসনের রূপরেখা অনুযায়ী কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সফল হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়া হবে; তবে ইরান যদি আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করা বন্ধ না করে, তবে প্রয়োজন হলে ‘অন্য যেকোনো কঠোর উপায়ে’ ইরানকে সামরিকভাবে মোকাবিলার বিকল্প পরিকল্পনাও মার্কিন পেন্টাগনের বিবেচনায় রয়েছে। তিনি আরও জানান, দোহা আলোচনার মূল এজেন্ডার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে পর্দার অন্তরালের আলোচনা বেশ ইতিবাচকভাবেই সামনের দিকে এগোচ্ছে এবং তেহরান হয়তো একটি বড় চুক্তিতে আসতে বাধ্য হবে। তবে একই সাথে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো কারণে এই দোহা বৈঠক ব্যর্থ হয়, তবে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে এমন বড় ধরনের হামলা চালানো হবে যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি। ট্রাম্পের এই কড়া হুমকির কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের নৌঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়, যাকে মার্কিন প্রশাসন ‘সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কোনো ধরনের মার্কিন সামরিক ব্ল্যাকমেইল বা হুমকির মুখে নতজানু হয়ে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না; বরং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং পারস্য উপসাগরে যেকোনো বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।



















