২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ সাত বছর পর তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে এক আমূল ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। পরিবর্তিত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী এবং কার্যকর করতে প্রায় ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে দলীয় নীতিনির্ধারকেরা। দলীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান আমিরের নেতৃত্বাধীন মেয়াদে এটিই হতে যাচ্ছে জামায়াতের গঠনতন্ত্রে সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী সংশোধনীর পদক্ষেপ। প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো দলের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নতুন একটি বিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং যুগের চাহিদানুযায়ী বিভিন্ন সাংগঠনিক ধারার পরিমার্জন করা।
জেলা ও মহানগর আমিরদের আর্থিক ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ
প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, দলীয় গঠনতন্ত্রের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৬৮ নম্বর ধারায় একটি সম্পূর্ণ নতুন উপধারা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উপধারার অধীনে জেলা এবং মহানগর পর্যায়ের আমিরদের একক আর্থিক ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দলীয় অর্থায়নের প্রকৃত উৎস এবং সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল ও স্পষ্টভাবে গঠনতন্ত্রে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আর্থিক শৃঙ্খলা আরও মজবুত হবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা।
বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, এই সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে দলীয় মজলিসে শুরা বৈঠকে নিবিড় আলোচনা হয়েছে। নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রস্তাবগুলো প্রথমে সংশোধনী কমিটি, পরে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং সর্বশেষ কেন্দ্রীয় শুরা পরিষদের চূড়ান্ত বিবেচনায় আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, “গঠনতন্ত্রের ২৩তম সংশোধনী প্রস্তাব শুরা সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে। তবে কিছু জটিল ও সংবেদনশীল প্রস্তাব নিয়ে এখনও চুলচেরা আলোচনা চলছে।”
অনাস্বাদিত উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের চিন্তাভাবনা
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনে একটি শক্তিশালী ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের পরিকল্পনা। এই পরিষদে এমন কিছু বিশিষ্ট ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে, যারা সরাসরি জামায়াতের আনুষ্ঠানিক সদস্য (রুকন বা কর্মী) না হলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে এই কৌশলগত বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে স্পষ্ট করেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
| সংশোধনী খাতের বিবরণ | প্রস্তাবিত লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক রূপরেখা |
| গঠনতন্ত্রের ২৩তম সংশোধনী | প্রায় ১৪টি ধারায় পরিবর্তন এনে আধুনিক ও যুগোপযোগী দলীয় রূপরেখা তৈরি। |
| আর্থিক জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা | ধারা ৬৮-তে নতুন উপধারা যুক্ত করে জেলা ও মহানগর আমিরদের ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ। |
| নতুন উপদেষ্টা পরিষদ | দলের বাইরে থাকা বিভিন্ন ক্ষেত্রের যোগ্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূল্যায়নের সুযোগ। |
| চূড়ান্ত অনুমোদন ও প্রকাশ | শুরা বৈঠকের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সংশোধনীগুলো দলীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ। |
সেক্রেটারি জেনারেল আরও জানান, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়টি নিয়ে শুরা সদস্যদের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে এবং আগামী পরবর্তী শুরা বৈঠকেও এটি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে। সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর এই সংশোধনীগুলো সর্বসাধারণের দেখার জন্য দলীয় অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত বা প্রকাশ করা হবে। দলীয় নীতিনির্ধারকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, জামায়াতের সামগ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং বর্তমান সময়ের উপযোগী করতেই এই সময়োচিত সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



















