টানা কয়েক দিনের মুষলধারে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। জেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে জেলার প্রধান দুই নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর উপচে পড়া পানি, যা বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগে জেলায় গত চার দিনে পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় জেলা ও উপজেলার মধ্যকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যার ফলে গ্রামীণ জনপদগুলো এখন পুরোপুরি অবরুদ্ধ।
৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত ও জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্কতা
বন্যা ও পাহাড়ধসের পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পুরো জেলা জুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ের পাদদেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে অনতিবিলম্বে ঘরবাড়ি ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, দুর্যোগ কবলিতদের জন্য জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা জোরদার, ত্রাণ বণ্টন ও জরুরি যেকোনো আইনগত সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সার্বক্ষণিক একটি সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
চকরিয়া-পেকুয়ায় চরম বিপর্যয় ও জলজটের কারণ
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও মাতামুহুরী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় ঘটেছে চকরিয়া এবং পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নে। স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকার কয়েকটি প্রভাবশালী মহলের মাছের ঘেরে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে রাখার কারণে মাঠপর্যায়ে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রশাসন দ্রুত এই অবৈধ ঘের কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনছে।
দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি প্রস্তুতি ও দ্বীপগুলোর নৌপথ অবরুদ্ধ
আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ত্রাণ হিসেবে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জরুরি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এছাড়া পুনর্বাসনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণের জন্য পর্যাপ্ত ঢেউটিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
| অবরুদ্ধ নৌপথের নাম | বর্তমান স্থিতি ও ভোগান্তির চিত্র |
| টেকনাফ-সেন্টমার্টিন | উত্তাল সাগরের কারণে টানা ৮ দিন ধরে সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। |
| কক্সবাজার-মহেশখালী | ৩ নম্বর সতর্ক সংকেতের কারণে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল স্থগিত। |
| পেকুয়া-কুতুবদিয়া | সাগরের তীব্র ঢেউ ও ঝোড়ো হাওয়ায় পারাপার বন্ধ; দ্বীপবাসী সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। |
সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় এবং ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি থাকায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে গত টানা ৮ দিন ধরে সব ধরনের যাত্রীবাহী ও মালবাহী নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। নৌপথ বন্ধ থাকায় কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের হাজার হাজার বাসিন্দা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।


















