দুর্গম পার্বত্য পথে হিমালয়ের চরম প্রতিকূলতা ও রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর পর কোনো বাংলাদেশি নারী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮.৮৬ মিটার) জয় করার এক অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছেন নুরুন্নাহার নিম্নি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের তৃতীয় নারী পর্বতারোহী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় নিজের নাম লিখালেন তিনি। এর আগে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ২০১২ সালের ১৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন নিশাত মজুমদার এবং একই বছরের ২৬ মে শিখর জয় করেছিলেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। দুই নারী বীরের সেই অবিস্মরণীয় কীর্তির পর দীর্ঘ এক যুগ বা ১৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশের কোনো নারী এভারেস্টের শিখর স্পর্শ করলেন। আজ বুধবার (২৭ মে) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের ঐতিহ্যবাহী পর্বতারোহণ সংস্থা বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) নুরুন্নাহার নিম্নির এই ঐতিহাসিক এভারেস্ট জয়ের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানানো হয়, আজ নেপালের স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৩৯ মিনিট) তিনি এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়ায় সফলভাবে আরোহণ করেন। নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক বিখ্যাত আন্তর্জাতিক অভিযান ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘এইটকে এক্সপেডিশন’ (8K Expedition)-এর লজিস্টিক ম্যানেজার অ্যাঙ তেম্বা শেরপা আনুষ্ঠানিকভাবে স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে নিম্নির এই গৌরবময় তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পর্বতারোহণের এই কঠিন মিশনটি সম্পন্ন করতে গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে উড়াল দিয়েছিলেন নুরুন্নাহার নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে বিমানযোগে লুকলা হয়ে তিনি সফলভাবে পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে (৫,৩৬৪ মিটার)। সেখানে প্রায় এক মাস অবস্থান করে ধাপে ধাপে অতিউচ্চতার (High Altitude) পাতলা বাতাস ও মাইনাস তাপমাত্রার পরিবেশের সঙ্গে নিজের শরীরকে খাপ খাইয়ে নেন বা অ্যাক্লিম্যাটাইজেশন সম্পন্ন করেন। সাধারণত মে মাসের ১৫ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যবর্তী সময়কেই এভারেস্ট সামিটের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ‘উইন্ডো’ বা সময় ধরা হয়। সেই অনুযায়ী গত ১৭ মে চূড়ান্ত আরোহণের জন্য বেজক্যাম্প ছাড়েন তিনি এবং ধাপে ধাপে ২৩ মে আরোহণ করেন ডেথ জোনের দ্বারপ্রান্তে থাকা ক্যাম্প–৪-এ। সেদিনই তিনি মূল শিখরের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত পুশ শুরু করলেও মাঝপথে আকস্মিক তীব্র তুষারঝড় ও ক্ষ্যাপাটে আবহাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে নিচে নেমে আসেন। তবে নিম্নি দমে যাননি; অনুকূল আবহাওয়ার আশায় বুক বেঁধে কয়েকদিন ক্যাম্প–২-এ অবস্থান করেন। পরবর্তীতে ২৫ মে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুকূলে আসার সংকেত পেয়ে তিনি আবারও নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করেন এবং মঙ্গলবার (২৬ মে) পুনরায় পৌঁছান ক্যাম্প–৪-এ। সেখান থেকেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমৃত্যু লড়াইয়ের চূড়ান্ত আরোহণ (Summit Push) শুরু করে আজ বুধবার নেপাল সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে এভারেস্টের শিখরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান তিনি। নেপালের অভিজ্ঞ এক শেরপা গাইড এই পুরো অভিযানে তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে ছিলেন।
পেশাগত জীবনে নুরুন্নাহার নিম্নি বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক পূবালী ব্যাংক পিএলসি–এর জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে সুনামের সঙ্গে কর্মরত আছেন। তাঁর এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দুঃসাহসিক বৈশ্বিক অভিযানের প্রধান স্পনসর ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকও ছিল তাঁর নিজের কর্মস্থল পূবালী ব্যাংক। রংপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা নিম্নির উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ভূতত্ত্ব (Geology) বিভাগে। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে অধ্যয়নকালীন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্ডওয়ার্কের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গিয়ে ট্র্যাকিং করার পর থেকেই দুর্গম পাহাড়ের প্রতি এক গভীর ও অবর্ণনীয় আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর মনে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বড় একটি সময় তাঁর কেটেছে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির গহীন পাহাড়ের ট্রেইলে ঘুরে ঘুরে। চাকরিজীবনে প্রবেশের পরও পাহাড়ের সেই তীব্র টান বা অ্যাডভেঞ্চারের নেশা বিন্দুমাত্র কমেনি; ছুটির সুযোগ পেলেই তিনি ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন মাঝারি উচ্চতার পাহাড়ে সফলভাবে ট্রেকিং সম্পন্ন করেছেন।
২০১৯ সালে নেপালের বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পে ঘুরে আসার পর থেকেই মূলত হিমালয়ের আরও উঁচুতে ওঠার বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিম্নি। এরপর ২০২০ সালে করোনাকালের মাঝেই তিনি সফলভাবে করেন এভারেস্ট বেজক্যাম্প (EBC) ও কালাপাথর ট্রেক। সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাই তাঁকে মূলত একজন সাধারণ ট্র্যাকার থেকে পেশাদার পর্বতারোহণের (Professional Mountaineering) কঠিন পথে নিয়ে যায়। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত ‘হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইনস্টিটিউট’ (HMI) থেকে পর্বতারোহণের ওপর উচ্চতর ও প্রাতিষ্ঠানিক মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। একই বছর তিনি বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্টজয়ী এমএ মুহিতের হাত ধরে যুক্ত হন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে। মূলত এই ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া সংগঠনের ব্যানারে ও কারিগরি নির্দেশনাতেই এবার ২০২৬ সালের একমাত্র বাংলাদেশি নারী অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট অভিযানে অংশ নিয়ে বাজিমাত করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি।
হিমালয় ও এভারেস্ট জয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর মাউন্ট এভারেস্টে প্রথম সফল মানব অভিযান পরিচালিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। ওই বছরের ২৯ মে নেপালের কিংবদন্তি শেরপা তেনজিং নোরগেকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমবার বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় পা রেখে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের অকুতোভয় পর্বতারোহী স্যার এডমন্ড হিলারি। এর বহু বছর পর বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন মুসা ইব্রাহীম, যিনি ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন। এরপর ২০১১ ও ২০১২ সালে দুবার এভারেস্ট জয় করার অনন্য কীর্তি গড়েন এমএ মুহিত। ২০১২ সালেই নারীদের পক্ষে নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্টের শিখরে ওড়ান বাংলাদেশের পতাকা। তবে ২০১৩ সালের ২০ মে এভারেস্টজয়ী পঞ্চম বাংলাদেশি সজল খালেদ শিখর জয় করে নামার পথে তীব্র কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে চূড়াতেই মারা যান, যা দেশের পর্বতারোহণে বড় ধাক্কা ছিল। এরপর দীর্ঘ ১১ বছরের এক বড় খরা কাটিয়ে ২০২৪ সালে এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া চন্দননগরের তরুণ বাবর আলী এবং বিগত ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট চূড়ায় ওঠার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন বাংলাদেশের ইকরামুল হাসান শাকিল। আর এবার ২০২৬ সালে পুরুষদের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র ও দেশের তৃতীয় নারী অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্টের বুকে বিশ্বজয় করলেন অদম্য নুরুন্নাহার নিম্নি, যা দেশের নারী জাগরণে এক নতুন মাইলফলক।



















