পবিত্র ঈদুল আজহার মাত্র দুই দিন আগে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর কালশী বস্তিতে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে প্রায় ১২০০ ঘর ও ভাঙারির দোকান। গতকাল সোমবার (২৫ সে) সন্ধ্যার এই প্রলয়ঙ্কারী আগুনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার নিম্নআয়ের মানুষ তাঁদের মাথার গোঁজার ঠাঁই এবং বহু বছরের জমানো স্বপ্ন হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার জানান, সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে ৯ মিনিটের মাথায় প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরবর্তীতে আগুনের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়ায় একে একে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের ১২৩ জন ফায়ার ফাইটার সেনা, র্যাব, পুলিশ ও স্থানীয় ভলান্টিয়ারদের সহযোগিতায় দীর্ঘ সোয়া দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তির সরু রাস্তা, পানির তীব্র সংকট এবং প্লাস্টিক-কাগজের মতো দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ন্ত্রণে ফায়ার ফাইটারদের চরম বেগ পেতে হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর কালশী বস্তির ধ্বংসস্তূপে এখন কেবলই কান্নার রোল আর নিঃস্ব মানুষের আহাজারি। মাগরিবের নামাজের পর বাসায় গিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নিজের ভাঙারির দোকান পুড়ে ছাই হতে দেখা আমেনা বেগম বুক চাপড়ে কাঁদছেন; কোনো মালামাল বের করতে না পারায় তাঁর শেষ সম্বলটুকু আর অবশিষ্ট নেই। ঈদ উপলক্ষে দোকানে নতুন মালামাল তোলা মুদি দোকানি কুলসুমের কণ্ঠেও একই দীর্ঘশ্বাস—পরনের কাপড় ছাড়া তাঁর আর কিছুই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এদিকে, প্লাস্টিক ব্যবসায়ী রহমান দাবি করেছেন, আগুনে তাঁর প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রহমান ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই অগ্নিকাণ্ডটি স্বাভাবিক কোনো দুর্ঘটনা নাও হতে পারে, কারণ গত রবিবারও (২৪ মে) এই এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর একটি অপচেষ্টা হয়েছিল যা স্থানীয়রা সময়মতো নিভিয়ে ফেলেছিলেন; এবার আর শেষ রক্ষা হলো না।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনের প্রকৃত সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের অন্তর্ঘাতের (নাশকতা) অভিযোগটিও খতিয়ে দেখা হবে। প্রত্যক্ষদর্শী সুমনের বিবরণ মতে, সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রথমে একটি বাঁশের ঘরে আগুন লাগার পরপরই তা পাশের প্লাস্টিক ও ভাঙারির দোকানে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। ঈদের ঠিক আগে সব হারিয়ে ছাইয়ের স্তূপের সামনে নির্বাক বসে থাকা কালশীর হাজারো ছিন্নমূল মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—মাথার ওপর ছাদ আর পকেটে টাকা ছাড়া নতুন করে কীভাবে শুরু হবে তাঁদের জীবনযুদ্ধ?



















